চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি, বিরল খনিজ রপ্তানিতে বেইজিংয়ের কড়াকড়ি এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা ব্রাসেলসের জন্য নতুন করে বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই টানাপোড়েন নিরসনে ইউরোপীয় পক্ষকে একতরফা চাপ সৃষ্টির পথ পরিহার করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে উন্মুক্ত সংলাপ ও গভীর সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
সম্প্রতি চীন থেকে পণ্য আমদানির ব্যাপক ঊর্ধ্বগতির জেরে ইইউয়ের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি দৈনিক ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। উদ্ভূত সংকট সমাধানে ইইউয়ের বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচ বেইজিং সফর করে চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিন মাস ধরে চলা এ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর ইস্যুটি নিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিদ্যমান মতভেদ দূর করতে খোলাখুলি সহযোগিতা ও সমমর্যাদার সংলাপ অপরিহার্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইউরোপীয় পক্ষ চীনের সঙ্গে যৌথভাবে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে কাজ করবে।
উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে বাণিজ্য ঘাটতি ও খনিজ নির্ভরতা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল অভিযোগ—চীনা পণ্যের জন্য ইউরোপের বাজার প্রায় উন্মুক্ত হলেও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে চীনে প্রবেশাধিকার ও ব্যবসা পরিচালনা বেশ কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রধান কাঁচামাল ‘বিরল খনিজ’ রপ্তানিতে চীনের কঠোর বিধিনিষেধ। এতে ইউরোপীয় সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) ঝুঁকিতে পড়েছে। যদিও বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে, তবে চীনের ওপর প্রযুক্তিগত নির্ভরতা রাতারাতি কমানো ব্রাসেলসের পক্ষে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় চীনের জন্যও ইউরোপীয় বাজার ও বিনিয়োগের সংযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেইজিং স্পষ্ট করেছে, তারা একতরফা দাবির কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ফ্রান্সের উচ্চপর্যায়ের পৃথক কূটনৈতিক উদ্যোগ
বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছে ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর শীর্ষ কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইমানুয়েল বোন আগামী ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর চীন সফর করবেন। সেখানে তিনি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে বৈঠক করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখতে ফ্রান্সের এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং ও ব্রাসেলস যদি বাজার প্রবেশাধিকার ও খনিজ সরবরাহে ভারসাম্যপূর্ণ কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে ইউরোপ ‘ডি-রিস্কিং’ বা চীননির্ভরতা কমানোর গতি আরও বাড়াবে। আর এর পরিণতিতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে তীব্র ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: মডার্ন ডিপ্লোমেসি