শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। বিশেষ করে, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির বিচার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে ২০১৩ সালে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছিলেন তিনি।
একই সময়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায়ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজীবী ও বিচারক।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর সামনে আসার পর বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের আমলে মানবাধিকার নিয়ে তার অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং মানবাধিকারের সুরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন এই মানবাধিকারকর্মী।
তবে নাভি পিল্লাইয়ের বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে তার সমালোচনার নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার উত্থাপিত প্রশ্নগুলো মূলত বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসরণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তাই এসব বক্তব্যকে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামল সম্পর্কে তার সামগ্রিক মূল্যায়ন হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ হবে না।
পিলখানা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
নাভি পিল্লাইয়ের আলোচিত বক্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তার উদ্বেগ। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত এ মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর পরদিন, ৬ নভেম্বর, বিচারপ্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পিল্লাই।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অপরাধের বিচার করতে গিয়ে অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, সেটিও নাভি পিল্লাইয়ের উদ্বেগের বিষয় ছিল।
তৎকালীন বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তার আপত্তির মধ্যে ছিল বিপুলসংখ্যক আসামিকে একসঙ্গে বিচারের মুখোমুখি করা, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ। হেফাজতে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা প্রমাণ আদালতে ব্যবহারের অভিযোগও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছিল।
এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন পিল্লাই। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। তবে সেই বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও উদ্বেগ
শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়া এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রতিরক্ষা পক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি যোগাযোগে আবদুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতে বিচার, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর পর্যাপ্ততা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। তবে এসব বিষয় ছিল প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও উদ্বেগ; এগুলোকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ছিল দুটি পৃথক ঘটনা ও স্বতন্ত্র বিচারপ্রক্রিয়া। নাভি পিল্লাইয়ের উদ্বেগের কেন্দ্রেও ছিল নির্দিষ্ট মামলাগুলোর ন্যায্যতা এবং সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার পরিস্থিতি। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, গুরুতর অপরাধের বিচার করার সময়ও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করতেন।
মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘ কর্মজীবন
নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী ও বিচারক। বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেন তিনি।
গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার বিচার তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষাও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাভি পিল্লাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় তার দীর্ঘদিনের ভূমিকা এই স্বীকৃতির কেন্দ্রে রয়েছে।