আলেম-ওলামাদের কারও রাজনৈতিক খেলার গুটি না হয়ে নিজেদের সুনির্দিষ্ট নীতি ও শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে চালক বা খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদে বায়তুল মোকাররমে চলমান ইসলামি বইমেলার মঞ্চে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এসব কথা বলেন। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও তাঁর পরবর্তী আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণে এনসিপির সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকা ‘তুরাস’–এর প্রথম সংখ্যার (উত্তরাধিকার, পর্ব–১) মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, অতীতে ভোটের সময় এলে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো টুপি-পাঞ্জাবি পরে বিভিন্ন মাদরাসায় গিয়ে আলেম হওয়ার ভান করত এবং নির্বাচন পার হলেই আলেম সমাজকে প্রান্তিক ও অনগ্রসর হিসেবে উপস্থাপন করত। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। আমরা যেন অন্য কারও রাজনৈতিক গেমের গুটি না হই, বরং নিজেদের খেলা নিজেরা খেলি।’
তিনি বিগত সরকারের আমলের নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে আলেম–ওলামাদের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে ওই অর্থে উল্লেখযোগ্য একাডেমিক কোনো কাজ হয়নি। সে ক্ষেত্রে ওলামা অ্যালায়েন্সের প্রকাশিত বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি শহীদের পরিবারের বক্তব্য নিয়ে আরো আগেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক মানের ডকুমেন্টেশন হওয়া উচিত ছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশের অন্য ধর্মাবলম্বীরা অনিরাপদ হয়ে পড়বেন—এমন প্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করতে আলেমদের কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। পাশাপাশি পরমতসহিষ্ণুতা চর্চা, নিজস্ব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। আলেমদের নিজস্ব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম তৈরি করার প্রয়োজনীতাও তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তা হিসেবে হাসনাত বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় একটা কার্ড খেলত যে তারা যদি না থাকে, তাহলে বাংলাদেশে থাকা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অন্যদের কাছে, অর্থাৎ আমাদের কাছে অনিরাপদ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো রাত জেগে পাহারা দিয়ে আমাদের আলেম–ওলামা ভাইয়েরা প্রমাণ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ মিথ্যার ওপর রাজনীতি করেছে।’
দেশের মাদ্রাসাশিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম-ওলামাদের উগ্রবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল এবং তাদের হাতে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়—এমন একটি বয়ান ৫ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এই ধারণা যে সঠিক নয়, তা নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করতে আলেমদের প্রতি আহ্বান জানান হাসনাত।
তিনি বলেন, ‘এটা যে মিথ্যা, তা আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আপনাদের ১ নম্বর দায়িত্ব হচ্ছে, অন্য ধর্মের যারা আছেন, তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণ, কালচার-কৃষ্টি যেন তাঁরা যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, সেদিকে লক্ষ রাখা।’
আসন্ন দুর্গাপূজার কথা উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘সামনে পূজা, একটা বৃহত্তর প্রোগ্রাম (উৎসব)। এ ছাড়া অন্যান্য ধর্মেরও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থাকে। এই জায়গাগুলোতে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা যেটা আমরা পালন করে আসছি, তা অব্যাহত রাখতে হবে।’
আলেমদের বিরুদ্ধে পরমতসহিষ্ণুতার অভাবের অভিযোগ যাতে উঠতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, ৫ আগস্টের পরে এসে ভিন্নমতের সঙ্গে আমাদের তর্কবিতর্ক হবে, কথা হবে। কিন্তু কোনোভাবেই যেন এই ট্যাগটা এই আওয়ামী সেট–আপের মিডিয়া দিতে না পারে, সেটা আমাদের দায়িত্ব ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আমাদের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, আমাদের নিজস্ব গণমাধ্যম তৈরি করতে হবে।’
বক্তব্যের পর হাসনাতসহ এনসিপি ও ওলামায়ে অ্যালায়েন্সের নেতারা ‘তুরাস’-এর প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন।