বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

চিকিৎসার বাইরে ৯২ শতাংশ মানসিক রোগী

‘তুই আমাকে মারার জন্যে আনছিস, আমাকে তুই বিয়ে দিবি’—এই দুইটা কথাই শুধু বলে আমার ১৪ বছরের মেয়ে আকলিমা বেগম। বলছিলেন কিশোরী আকলিমার বাবা রিকশাচালক জাকির হোসেন। তিনি এসেছেন কুমিল্লার দেবীদ্বার থেকে। এই বাবা জানান, মেয়ের জ্বর হয়েছিল, এরপর থেকে মেয়ে শুধু উলটাপালটা বকে। ১ হাজার টাকা ভিজিট দিয়া বড় ডাক্তার দেখাইছি কুমিল্লায়, সেইখানে ক্লিনিকে ছিল ১০ দিন, এরপর তারা আমাদের শ্যামলী মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে আসার পরামর্শ দেন। এই হাসপাতালে আছি আজ ১৬ দিন ধরে। মেয়ের কোনো উন্নতি নাই।

শ্যামলী জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ষষ্ঠ তলায় নারী ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়াতেই ডান দিক থেকে ভেসে আসে—আবেগি করুণ এক চিত্কার, বারবার সেই একই চিত্কার। কাছাকাছি কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। জানা যায়, কোনো এক কক্ষে হয়তো আছেন ঐ রোগী। অন্য পাশে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে কিশোরী কন্যাকে ওয়ার্ডের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে মা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। জানতে চাই—মেয়ের কী সমস্যা? মা জানান—‘মেয়ের মোবাইল আসক্তি ছিল। এখন অনেকটা ভালো। চিকিত্সক বলেছেন, সামনের সপ্তাহে রিলিজ দিতে পারে। মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, কিন্তু স্কুলে যেতে চাইত না। বাসায় থাকতে চায় এবং সে শুধু মোবাইল ফোন দেখবে।’ এই মা মেয়েকে নিয়ে এসেছেন পাবনা থেকে। জানান, পাবনা মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে অপ্রাপ্ত বয়স্ক রোগীদের ভর্তি নেন না। ফলে মেয়ের চিকিত্সা নিতে ঢাকার এই হাসপাতালে আসা।

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় অংশই প্রয়োজনীয় চিকিত্সা পায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা, চিকিত্সা সম্পর্কে অজ্ঞতা, পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ ও সেবাকেন্দ্রের অভাব এবং চিকিত্সার ব্যয়—সব মিলিয়ে মানসিক রোগীরা চিকিত্সার বাইরে রয়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক পরিবার মানসিক রোগকে শারীরিক রোগের মতো গুরুত্ব দেয় না এবং তারা মনে করেন—মানসিক সমস্যায় চিকিত্সকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই অথবা সময়ের সঙ্গে সমস্যা এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। আবার সামাজিকভাবে ‘পাগল’ তকমা পাওয়ার ভয়েও অনেকে চিকিত্সা নিতে চান না।

গবেষণার তথ্য বলছে—দেশে মানসিক রোগীর মধ্যে চিকিত্সার বাইরে রয়েছে ৯২ শতাংশ রোগী। এরমধ্যে পুরুষের চেয়ে নারী বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় করা ‘ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী—দেশে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানসিক রোগী রয়েছে। যাদের মধ্যে পুরুষ ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ আর নারী ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর শিশু-কিশোর রয়েছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ রোগী চিকিত্সার বাইরে। 

এমন পরিস্থিতিতে আজ ১০ অক্টোবর পালিত হবে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে— ‘জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শুনুন :বাস্তব কণ্ঠ, বাস্তব পরিবর্তন।’ ভাবার্থ করা হয়েছে—‘রোগীর কথা শুনতে হবে’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৬ সালের এই ক্যাম্পেইনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে জীবনযাপন করা ব্যক্তিদের মতামতকে মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। যাদের নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও নীতি তৈরি হবে, তাদের মতামত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে থাকতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে হাসপাতালকেন্দ্রিক না রেখে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সমপ্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক রোগ শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে চিকিত্সার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষকে সেবার আওতায় আনা সম্ভব।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব  সাইকিয়াট্রিস্টস (বিপিএ) সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য শুধু অসুখ নিয়ে নয়, অসুখের বাইরেও চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। আমাদের জনসচেতনতার অভাব আছে, আমাদের দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে, আমাদের সেই জায়গায় গুরুত্ব দিতে হবে; জনবল বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকারের মানসিক দৃষ্টি আছে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর। তিনি বলেন, আমরা যে কোনো রোগপ্রতিরোধ করতে চাইলে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনেও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অপরিসীম বলে জানান।