১০ লক্ষণ দেখে বুঝবেন আপনি কালো জাদুতে আক্রান্ত ও ক্ষতি থেকে বাঁচার ৫ আমল

জাদু হচ্ছে শয়তানি কাজ। কিছু মানুষ নিজেদের হীনস্বার্থ, হিংসা কিংবা প্রতিশোধের কারণে এই শয়তানি কাজ বেছে নেয়। এর মাধ্যমে তারা অন্যের ক্ষতি করতে চায়। কুফরি কালাম বা কালো জাদুর আশ্রয় নিয়ে তাবিজ-কবজ করার ব্যাধি বর্তমানে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ অপরের অনিষ্ট কামনায় লিপ্ত হচ্ছে ব্ল্যাক ম্যাজিকের মতো নিকৃষ্ট পন্থায়।

জাদুর মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করা, অসুস্থ করে তোলা কিংবা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে। যুগে যুগে শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ এ অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে।

কারও ওপর কালো জাদুর প্রভাব পড়লে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। এর উল্লেখযোগ্য ১০টি লক্ষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. অস্বাভাবিক শারীরিক সমস্যা: হঠাৎ গুরুতর অসুস্থতা বা তীব্র মাথাব্যথা, যা মেডিকেল টেস্টে ধরা পড়ে না। শরীরে অকারণে দুর্বলতা ও নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা বা অবশ ভাব থাকা।

২. অস্বস্তিকর স্বপ্ন ও আচরণ: বারবার ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করা, সব সময় ঝিমানো, অনবরত হাই তোলা ও কান্নাকাটি করা।

৩. একাকিত্ব ও বিষণ্নতা: অকারণে রাগ বা ভয় পাওয়া, সব সময় একা থাকতে চাওয়া এবং ক্ষুধামন্দায় ভোগা।

৪. অস্বাভাবিক আচরণ ও আলসেমি: নিজের অজান্তে অদ্ভুত শব্দ করা কিংবা ঘরসংসার ও স্বাভাবিক কাজে অনীহা।

৫. বিবাহিত জীবনে অশান্তি: কারণ ছাড়াই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অস্বাভাবিক ঘৃণা, দূরত্ব তৈরি হওয়া বা দৈহিক সম্পর্কের প্রতি চরম অনীহা।

৬. ধর্মীয় কাজে বাধা: কোরআন তিলাওয়াত শুনতে বা করতে কষ্ট হওয়া, নামাজ ও জিকিরে চরম অস্বস্তি লাগা।

৭. গৃহস্থালিতে অশান্তি: বাড়িতে অকারণ ঝগড়া বা দুর্ঘটনা ঘটা এবং বিষাক্ত বা কালো প্রাণীর (যেমন সাপ, কালো কুকুর) অস্বাভাবিক উপস্থিতি।

৮. অতিপ্রাকৃত ঘটনা: অদৃশ্য শব্দ শোনা, ছায়া দেখা বা ঘরের জিনিসপত্র নিখোঁজ হওয়া।

৯. শারীরিক পরিবর্তন: হঠাৎ চেহারা বা চুলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসা এবং চিকিৎসা দিয়ে সারানো যায় না—এমন নীল-কালো দাগ পড়া।

১০. রুকইয়াহ চলাকালে প্রতিক্রিয়া: কোরআনিক চিকিৎসা (রুকইয়াহ) চলাকালে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বমি বা অস্থিরতা দেখা দেওয়া।

জাদুর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার দিকনির্দেশনাও দিয়েছে ইসলাম। কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত দোয়া পাঠ করলে জাদুর ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও অসুস্থ সাহাবিদের ওপর ঝাড়ফুঁক করতেন, তাদের জন্য বিশেষ দোয়া করতেন। একদা রাসুল (সা.)-এর ওপরও জনৈক ইহুদি জাদু করেছিল। তখন সুরা নাস, ফালাকসহ বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে জাদু থেকে মুক্ত হন। সেসব দোয়ায় আল্লাহর কাছে সরাসরি আশ্রয় ও আরোগ্য প্রার্থনা করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, জাদুর প্রভাব থাকলেও সেটার প্রতিকার আল্লাহর ইচ্ছাতেই সম্ভব।

চলুন জেনে নিই কালো জাদুর ক্ষতি থেকে বাঁচার ৫ আমল

এক. উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় যে ব্যক্তি তিনবার নিচের দোয়াটি পাঠ করবে, কোনোকিছুই তার অনিষ্ট করতে পারবে না। দোয়াটি হলো, بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাজি লা-ইয়াদুররু মাআস্‌মিহি শাইয়্যিন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস-সামায়ি ওয়া-হুয়াস-সামিউল আলিম।

অর্থ: আমি আল্লাহর নাম নিচ্ছি। জমিন ও আসমানের কোনোকিছুই যার নামের বরকতে ক্ষতি সাধন করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। (তিরমিজি : ৩৩৮৮)

দুই. সকাল সন্ধ্যার আরেকটি দোয়া أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণ: আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিনশাররি মা খালাকা।

অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর অসিলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার মন্দ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এই দোয়াটি সন্ধ্যার সময় পড়লে ওই রাতে কোনো সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি কষ্ট দিতে পারে না। (তিরমিজি : ৩৪৩৭)


তিন. জাদু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবীজিকে (সা.) এই দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়েছিলেন। بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরক্বিকা মিন কুল্লি শাইয়্যিন ইয়্যুজিকা মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হা-সিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।

অর্থ: আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়-ফুঁক করছি, সকল কষ্টদায়ক বিষয় থেকে। প্রত্যেক আত্মা ও ঈর্ষাপরায়ণ চক্ষুর অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়-ফুঁক করছি। (মুসলিম ২১৮৬, তিরমিজি ৯৭২)

চার. সুরা ফালাক ও নাস এক্ষেত্রে অনেক বেশি উপকারী। সকাল-সন্ধ্যা সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস প্রতিটি তিনবার করে পড়ার পরামর্শ দেন আলেমগণ।

পাঁচ. সুরা ফাতিহার অন্য নাম হলো সুরা শিফা অর্থাৎ আরোগ্য লাভের সুরা। এই সুরাও পড়া যেতে পারে।

নবী করিম (সা.)-এর ওপর জাদু ও তাঁর ঝাড়ফুঁকের দোয়াটি পাঠ করা। প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপরও একবার কালো জাদু প্রয়োগ করা হয়েছিল। তখন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁকে নিম্নোক্ত দোয়াটি শিখিয়েছিলেন :

‘বিসমিল্লাহি আরকিকা। মিন কুল্লি শাইয়িন ইউজিকা। ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিক। বিসমিল্লাহি আরকিক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৮৬)

সুরা ফাতিহা ‘সুরা শিফা’ নামে পরিচিত। এটি আরোগ্যের জন্য উপযোগী।

জাদু, কুফরি ও শয়তানের ফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে ঈমান ও পবিত্রতার সঙ্গে থাকতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।

ইসলামে কালো জাদুর অবস্থান

ইসলাম ধর্মে কালো জাদু তথা ক্ষতিকর তন্ত্রমন্ত্র সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং কুফরি কাজ হিসেবে চিহ্নিত।

এই পাপ কাজে লিপ্ত ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করে, তবে সে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তির জন্য অনুশোচনা ও তাওবা একান্ত প্রয়োজন নতুবা ইসলামী আইন অনুযায়ী কঠোর দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য সে।
নবী করিম (সা.) বলেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী জিনিস থেকে বেঁচে থাকো—১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, ২. জাদু করা, ৩. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, ৪. সুদ খাওয়া, ৫. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, ৬. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা, ৭. নিরপরাধ নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৬৪)