ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আয়োজিত এ কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ করেন ধ্রুব রাঠি। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতার সম্পূর্ণ অভাব রয়েছে। কমিশনের কোনো জবাবদিহিও নেই। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমি এখানে সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আসিনি।
কে এই ধ্রুব রাঠি
ধ্রুব রাঠির সশরীরে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ ভারতের ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিষয়ে তথ্যনির্ভর ভিডিও তৈরি করে পরিচিতি পাওয়া এই ইউটিউবারের অনুসারী রয়েছেন লাখো মানুষ।
ধ্রুব রাঠির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, তার জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর। ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোহতকের একটি হিন্দু জাট পরিবারে।
বাবা মহাবীর রাঠি, মা ঊর্মিলা রাঠি। ওয়েবসাইটে বলা হয়, একটি আন্তরিক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় মা–বাবা ধ্রুব রাঠির মধ্যে কঠোর পরিশ্রম, শ্রদ্ধাবোধ ও জানার আগ্রহের মতো মূল্যবোধগুলো গড়ে তুলেছিলেন। একটি সুশিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাবলির প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। ভালোবাসা ও শেখার আনন্দে ভরা হরিয়ানায় কাটানো শৈশব তার পরবর্তী জীবনে শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছে। হরিয়ানায় বেড়ে ওঠা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবন—উভয় ক্ষেত্রেই তার আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে হরিয়ানায় কাটানো শৈশবের বড় অবদান রয়েছে।
দেশের সীমানা পেরিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করার আগে ধ্রুব রাঠি হরিয়ানায় তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে জার্মানিতে পাড়ি জমান। তিনি জার্মানির স্বনামধন্য কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (কেআইটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন।
ভারত থেকে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর এই পরিবর্তন ধ্রুব রাঠির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে একই সঙ্গে তা ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই শিক্ষাজীবন ও কনটেন্ট তৈরির জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়।
স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ধ্রুব রাঠি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে পরবর্তী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বব্যাপী ক্ষেত্রটির গুরুত্ব তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি কেআইটিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর মাধ্যমে টেকসই জ্বালানি সমাধান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতা আরও সুদৃঢ় হয়।
ওয়েবসাইটে বলা হয়, এই শিক্ষাজীবন ধ্রুব রাঠিকে শুধু প্রকৌশলের ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানই দেয়নি, বরং নিজের ইউটিউব চ্যানেল শুরু করার সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে।
ধ্রুব রাঠি লিখেছেন, ‘বর্তমানে আমি জার্মানিতে বসবাস করলেও ভারত সব সময়ই আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি দেশ হয়ে থাকবে। আমি নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করি। আমার কনটেন্টের মাধ্যমে দেশটির অগ্রগতি ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি।’
ধ্রুব রাঠির ইউটিউব চ্যানেল শুরু করার পেছনে আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। জ্ঞান ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রতি তার আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকেই এর সূচনা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্ম তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, যা তাকে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গভীর বিশ্লেষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ কনটেন্টের জন্য পরিচিত তাঁর এই চ্যানেল এখন এমন একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে বিনোদনের মেলবন্ধন ঘটেছে।
২০১৩ সালে ইউটিউবের জগতে ধ্রুব রাঠির পথচলা শুরু হয়, জার্মানিতে কলেজজীবনে থাকাকালে। ওয়েবসাইটে বলা হয়, শুরুতে তার চ্যানেলটি ছিল নিছক শখের একটি মাধ্যম, যেখানে তিনি প্রযুক্তি ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার চিন্তাভাবনা–জ্ঞান ভাগাভাগি করে নিতেন। এসব বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহের পেছনে ছিল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশল নিয়ে তার পড়াশোনা।
বছরের পর বছর ধরে ধ্রুব রাঠির ভিডিওগুলোয় সামাজিক সমস্যা থেকে শুরু করে ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসতে শুরু করে। তিনি লিখেছেন, ‘এই দীর্ঘ পথচলায় আমার লক্ষ্য সব সময় একই থেকেছে—দর্শকদের সামনে পক্ষপাতহীন ও তথ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা।’
২০১৩ সালে ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন ধ্রুব রাঠি। প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শুরুতে প্রযুক্তি ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করতেন।
২০১৪ সালে ধ্রুব রাঠির কোনো ভিডিও প্রথমবারের মতো ভাইরাল হয়। বিজেপি সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে তিনি এই ভিডিও তৈরি করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে তার যাত্রা শুরু হয়।
২০১৮ সালে দ্বিতীয় ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন ধ্রুব রাঠি। ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য ‘ধ্রুব রাঠি ভ্লগস’ নামের দ্বিতীয় চ্যানেলটি চালু করেন তিনি।
২০২২ সালে ধ্রুব রাঠির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রাইবার ও অনুসারীর সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করে। এটি ছিল তার কাজের প্রভাব ও জনপ্রিয়তার প্রতিফলন। বিষয়টি তাকে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ইউটিউবার হিসেবে পরিচিতি পেতে সহায়তা করে।
২০২৩ সালে ‘ধ্রুব রাঠি একাডেমি’ চালু হয়। নাস একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে এটি চালু করেন ধ্রুব রাঠি। এখানে তিনি প্রথম সময় ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কোর্স নিয়ে আসেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত অনুসারী?
ধ্রুব রাঠির মূল ইউটিউব চ্যানেল ‘@DhruvRathee’-এর সাবস্ক্রাইবার ৩ কোটি ৩০ লাখ। ভ্রমণবিষয়ক চ্যানেল ‘@DhruvRatheeVlogs’-এ সাবস্ক্রাইবার ৩৫ লাখ ৩০ হাজার।
এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ‘@dhruvrathee’ অ্যাকাউন্টে তার অনুসারী ১ কোটি ৯১ লাখ। ফেসবুকে তার অনুসারী ৭৬ লাখ এবং এক্সে ‘@dhruv_rathee’ অ্যাকাউন্টে অনুসারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক নানা বিষয়ে ভিডিও তৈরি করে ধ্রুব রাঠি ইউটিউবের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলাই তার কনটেন্ট তৈরির অন্যতম লক্ষ্য।