শ্রীপুরের নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরই পরিত্যক্ত, ফাঁকা

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন ২ নম্বর গাজীপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে ৮.৯ একর সরকারি খাস জমিতে আওয়ামী লীগ সরকার গড়ে তোলে ঢাকা বিভাগের বৃহত্তম আশ্রয়ণ প্রকল্প, যার নাম দেওয়া হয় ‘নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প’। ২০২৩ সালে কথিত ১৪২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়। নামেমাত্র ভূমিহীন, গৃহহীন বিধবা, প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, দিনমজুর ও বয়স্কসহ অসহায় পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে নির্মাণ করা হয়েছিল এসব ঘর। সেই সময়ে প্রতিটি বাড়ি নির্মাণে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা করে। দুটি শয়নকক্ষসহ প্রতিটি ঘরে করা হয়েছিল বারান্দা, রান্নাঘর ও একটি টয়লেট। ঘরগুলোতে পৃথক মিটারে বিদ্যুৎ-সংযোগের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট সুবিধাও। এখানে বসবাসকারীদের জন্য রাখা হয়েছিল পুকুর, মসজিদ, স্কুল-কাম অধ্যয়ন কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার-কাম স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, কবরস্থান, প্রশস্ত সড়ক ও সোলার স্ট্রিট লাইট।

সব সুবিধা থাকার পরও এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরেই এখন ঝুলছে তালা। ব্যবহার না করায় বা ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ায় তালাবদ্ধ ঘরগুলোর আগে-পিছে ডানে-বামে আগাছায় ভরা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের সঠিকভাবে বাছাই না করার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন বসবাস না করায় ঘরে লাগানো বিদ্যুতের বিল বকেয়া থাকার কারণে মিটারগুলোও খুলে নিয়েছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। জানা যায়, উদ্বোধনের দিন এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর বরাদ্দ নিতে আসেন এক নারী। তিনি ঐদিনই চলে যান এবং আর কখনো ফিরে আসেননি। ঐ ঘরে এখন বসবাস করছেন আমেনা নামে অন্য এক নারী। তিনি জানান, সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ায় বরাদ্দ পাওয়া একটিমাত্র ঘরে বসবাস করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। তার পাশের ঘরটিই বরাদ্দ পেয়েছিলেন সেই নারী, যার খালি ঘরে সব সময়ই তালা ঝুলছিল। এতে ঘরের সামনে ময়লা-আবর্জনা, লতা ও ঘাস জন্মেছিল। পরে ঐ নারীকে তিনি অনুরোধ করেন, ঘরটিতে যেন তার সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতে দেওয়া হয়। তিনি তাতে রাজি হন। ঘর বরাদ্দ পাওয়া আরেক জন সালমা বেগম। তিনি চাকরি করেন একটি গার্মেন্টস্ কারখানায়। সালমা বলেন, চাকরি করে যা বেতন পাই তার পুরোটাই খরচ হয়ে যায় যাতায়াতে। তাই কারখানার পাশে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছি। মাঝেমধ্যে এসে ঘর পরিষ্কার করে যাই।

২০২৩ সালে নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন আজিজুল হক। বরাদ্দ পাওয়ার সময় স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ঘরে উঠেছিলেন। বর্তমানে দুই সন্তান সংসারী হয়েছে। স্ত্রী, দুই সন্তান এবং পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে একটা মাত্র ঘরে বসবাস করছিলেন কোনোমতে। জায়গা না হওয়ায় বড় ছেলে পরিবার নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাইরে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি দাবি করেন, যেসব ঘরে মানুষজন বসবাস করছে না, সেগুলোর বরাদ্দ বাতিল করে দিয়ে ঐ ঘরগুলো যেন বড় সংসারের সদস্যদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বসবাসকারী অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী ও সরকারি প্রকৌশল বিভাগের লোকজন আর্থিকভাবে লাভবান হতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকৃত উপকারভোগীদের বঞ্চিত করে অপেক্ষাকৃত বিত্তবানদের ও নিজস্ব স্বজনদের এসব ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন।

নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক নছুমউদ্দিন বলেন, ১৪২টি ঘরের মধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ ঘরে বরাদ্দ পাওয়া বাসিন্দারা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। বাকি ঘরগুলো সব সময় খালিই পড়ে আছে এবং ঐ ঘরগুলোই তালাবদ্ধ বা পরিত্যক্ত হয়ে আছে। বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনেকে কয়েক মাস পরপর এসে বিদ্যুৎবিলের কাগজ নিয়ে চলে যায়। অনেকেরই বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় মিটার খুলে নিয়ে গেছে পল্লী বিদ্যুৎ। অনেকের বাড়ির পানির মোটর, জানালার গ্রিল চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যারা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল ও নতুন তালিকা তৈরি করে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মধ্যে ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান নছুমউদ্দিন। 

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভুঞা বলেন, 'ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে কেউ বসবাস করছেন না-এমন বিষয় আমাদের কমিটির কাছে উপস্থাপন করলে আমরা রি-প্লেসমেন্ট করে থাকি। আমরা নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়টিও যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'