যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সামরিক হামলার হুমকির মধ্যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে কাজ করছে ইরান। এদিকে তেহরানকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে মস্কো। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে (৯ শুক্রবার) অক্টোবরপ্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক মাসের বিমান হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। দেশটির অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যালিস্টিক ও কিছু জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও ইরানের হাতে রয়েছে।
পশ্চিমা এক কর্মকর্তা ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, প্রয়োজনে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে তেহরানের। রাশিয়া ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি। গত জুনে করা একটি পৃথক গোয়েন্দা মূল্যায়নেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছিল। এ বিষয়ে জানতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পায়নি ব্লুমবার্গ।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এই মূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের আগের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, টানা আট মাসের বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মূল্যায়ন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও হামলা শুরু করলে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা এখনো রয়েছে তেহরানের।
এদিকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা বাড়িয়েছে ইরান। গত সপ্তাহে অন্তত ১০টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্লুমবার্গের মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক এবং বর্তমানে কিংস কলেজ লন্ডনের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো জিম ল্যামসন বলেছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর আগে ইরানের হাতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। বর্তমানে এর কতগুলো অবশিষ্ট রয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, গত জুনে করা পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ শুরুর আগের মজুতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ধরে রাখতে পেরেছিল ইরান।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ৪ হাজারের বেশি শাহেদ ড্রোন এবং অন্তত ২ হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের প্রতিরক্ষা গবেষণা বিভাগের প্রধান বেকা ওয়াসার মনে করেন, মার্কিন হামলা আপাতত বন্ধ থাকায় ইরান পরবর্তী সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার সময় পাচ্ছে। তার মতে, কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট সামরিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে শুক্রবার রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে একটি সমঝোতার ঘোষণা আসে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
সমঝোতার অংশ হিসেবে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর রাজস্ব আয় সীমিত করতে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ফলে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের চাপের নীতিতে এই পদক্ষেপকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত মাসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৩ সাল থেকে রাশিয়া গোপনে ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ প্রকৌশলীরা ইরানকে র্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরিতে সহযোগিতা করছেন। এই প্রযুক্তি ইরানের নৌবাহিনীকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজসহ অন্যান্য সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অস্ত্র তৈরির সুযোগ দিতে পারে।
সূত্র: ব্লুমবার্গ