জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়ম

ভোটার আকৃষ্ট করতে অনেক কিছুই করতে হয়: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা

সরকারি কর্মকর্তা কিংবা ইউপি সদস্য না হয়েও ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জেলেদের বরাদ্দের চাল বিতরণ করার অভিযোগ উঠেছে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে। এমনকি মাস্টাররোল ও জেলে কার্ড ছাড়াই নিজের দেওয়া স্লিপে চাল বিতরণ এবং ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী জেলেরা।

রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরভাগা ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ইমরান হোসেন বাবু বকাউল সখিপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, মা ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময় জেলেদের খাদ্য সহায়তায় নিবন্ধিত প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। চরভাগা ইউনিয়নে মোট ১ হাজার ৬৭৮ জন কার্ডধারী জেলের জন্য এ চাল বরাদ্দ রয়েছে।

রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের আলাদা কক্ষে বসিয়ে রেখে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে চাল বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করছেন ইমরান হোসেন বাবু বকাউল।
 
অভিযোগ উঠেছে, কোনো ধরনের মাস্টাররোল যাচাই না করেই জেলে কার্ডবিহীন ব্যক্তিদের নিজের স্বাক্ষরিত স্লিপ দিয়ে তিনি চাল বিতরণ করছেন। এছাড়া নির্ধারিত ২৫ কেজির পরিবর্তে ২৩ কেজি করে চাল দেওয়ার অভিযোগ করেন সাধারণ জেলেরা। এ নিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রায় এক ঘণ্টা চাল বিতরণ বন্ধ রাখে প্রশাসন। পরে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে পুনরায় বিতরণ শুরু হয়।

চরভাগা বাঁশতলা এলাকার কার্ডধারী জেলে সুমন মিয়া বলেন, সকাল থেকে কার্ড হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু চাল পাচ্ছি না। অথচ যারা জেলেও না, কার্ডও নেই—তাদের নাম ডেকে ডেকে চাল দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে বাবু বকাউল হুমকি দেন।

একই এলাকার জেলে রিয়াদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার দিল ২৫ কেজি, আমরা পেলাম ২৩ কেজি। প্রতিবার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বিতরণ করে, এবার দেখি বিএনপি নেতারা পরিষদ দখল করে চাল দিচ্ছে। যাদের কাছে বাবু বকাউলের দেওয়া স্লিপ আছে, তাদের আগে চাল দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ইমরান হোসেন বাবু বকাউল বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ আমাকে বিষয়টি দেখভালের জন্য পাঠিয়েছেন। কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা তদারকি করছি।
 
কার্ড ছাড়া স্লিপ দিয়ে চাল দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি রাজনীতি করি, সামনে নির্বাচন। তাই ভোটারদের আকৃষ্ট করতে অনেক কিছুই করতে হয়।

চরভাগা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ইব্রাহিম মল্লিক জানান, কাগজে-কলমে জেলেদের চাল বিতরণের দায়িত্ব আমাদের হলেও বাস্তবতায় আমরা পরিষদে ঠিকমতো বসতেই পারি না। স্থানীয় এমপির প্রতিনিধিরা এসে সব নিয়ন্ত্রণ করছে। দুপুরে শুনেছি কার্ড ছাড়াই স্লিপে চাল দেওয়া হচ্ছিল। পরে প্রশাসন বিষয়টি জেনে কিছু সময় বিতরণ বন্ধ রাখে।

চাল বিতরণের দায়িত্বে থাকা ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিপন মিয়া বলেন, দুপুরে কিছু অনিয়মের খবর পেয়ে মৎস্য কর্মকর্তার নির্দেশে চাল বিতরণ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে তিনি এসে পুনরায় কার্যক্রম চালু করেন।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ইউএনও মহোদয়ের কাছ থেকে অনিয়মের তথ্য পেয়ে ট্যাগ অফিসারকে তাৎক্ষণিক বিতরণ বন্ধ রাখতে বলি। পরে আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছে কার্ড পরীক্ষা করে চাল বিতরণ শুরু করি। কার্ড ছাড়া কাউকে চাল দেওয়া হবে না।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুবকর সিদ্দিক জানান, কার্ড ছাড়া স্লিপের মাধ্যমে চাল বিতরণের খবর পেয়ে মৎস্য কর্মকর্তাকে দ্রুত সেখানে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নিয়ম অনুযায়ী চাল বিতরণ করা হয়েছে। জেলেদের চাল বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।