আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরিধানে নিষেধাজ্ঞা: নেপথ্যে কী

ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের নামে আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরিধানে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ক্লাস বর্জন থেকে শুরু করে চলছে অনশন।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে অনুমোদিত সংশোধনীতে মুসলিম নারীদের হিজাবকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা না হলেও, স্কুলে এমন পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা সরকারের মতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি’ লঙ্ঘন করে।

এর আগেও একই ধরনের নিয়মের কারণে হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রশ্ন উঠছে, পেশাগত পোশাকের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে গিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মীয় অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করছে কি না কর্তৃপক্ষ!

ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি নাকি ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতা-আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিতর্ক। সেপ্টেম্বরে অনুমোদিত পোশাকবিধির সংশোধনী ঘিরে এ বিতর্কের সূত্রপাত। 

স্কুলে আর হিজাব পরতে বাধার কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা।

তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। আমি কষ্ট পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘হিজাব একটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, এবং যদি কোনোদিন আমি তা খুলে ফেলতে চাই, সেটাও আমারই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।’

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক স্কুলে পরা যাবে না। এর জেরে দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ।

রাষ্ট্রায়ত্ব সংবাদ সংস্থা এপিএর দাবি, নতুন বিধির লক্ষ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিন্ন পোশাকবিধি নিশ্চিত করা। তবে সরকারের এই যুক্তি মানতে নারাজ সমালোচকরা। প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ আজারবাইজানের সংবিধানে একদিকে রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা হয়েছে, অন্যদিকে নিশ্চিত করা হয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতাও।

তাই প্রশ্ন উঠেছে—ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে কি না। সরকারপক্ষের বক্তব্য, বিশেষ উদযাপনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরার সুযোগ রয়েছে, তবে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন।

সমালোচকরা বলছেন, পোশাক শুধু পেশাগত পরিচয়ের অংশ নয়, এটি মতপ্রকাশেরও একটি মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক।

এদিকে স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলে প্রবেশে বাধা পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর, অন্তত দুটি স্কুলে ক্লাস বর্জন করেছে শিক্ষার্থীরা। দেশটির এক শিক্ষিকা আল জাজিরাকে বলেন, হিজাব পরা বা খুলে ফেলা—দুটিই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।

আজারবাইজানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিতর্ক পৌঁছেছে তুরস্কেও। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। ১৯৯৭ সালে তুরস্কে হিজাব পরা নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা এবং সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্তের ঘটনার সঙ্গেও তুলনা করেছেন কেউ কেউ।

এ পরিস্থিতিতে সরাসরি তুরস্কের নাম না নিয়ে পরোক্ষ সমালোচনা করেছেন আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। নিজের দলের সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, আজারবাইজানের জীবনযাপনের ধরনে যেন কেউ হস্তক্ষেপ না করে।