কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে শ্রীলঙ্কার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া এখনো নাজুক। এর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনো পরিস্থিতি দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করেছে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, গত বছরের ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহর কারণে প্রায় ৬৫০ জনের মৃত্যু এবং কয়েক শ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে বিভিন্ন সম্পদের মূল্য কমেছে এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বেড়েছে। ২০২২ সালে সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার সংকট কাটিয়ে ওঠার সময়েই দেশটি এসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সোমবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ‘এল নিনোর মতো জলবায়ুসংশ্লিষ্ট ঝুঁকি এবং আর্থিক বাজারে উচ্চ অস্থিরতা দেশের জন্য একটি কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহর কারণে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি ডলার। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ১৬০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
২০২২ সালের এপ্রিলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ায় খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির অর্থ জোগাড় করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। এর ফলে দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়।
খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকটের কারণে দেশজুড়ে কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ চলে। এর জেরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
২০২৩ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ২৯০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা পাওয়ার পর শ্রীলঙ্কা বিদেশি ঋণ পুনর্গঠন করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, দেশটির অর্থনীতি সংকট-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে এসেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়ার পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ঘটনা বাড়তে পারে, যার ফলে ব্যাংকগুলোও ক্ষতির মুখে পড়বে।
শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া বিভাগ ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। এরপর আগামী বছরের শুরুর দিকে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়া বিভাগ বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতিকে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এল নিনোসংশ্লিষ্ট বর্তমান আবহাওয়ার পরিস্থিতির কারণে ঋণের গুণগত মানের অবনতি ঘটতে পারে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।’
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে চরম আবহাওয়া সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডলে বেশি শক্তি ও জলীয় বাষ্প জমা হতে পারে।