ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় প্রযুক্তির সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

আমাদের চারপাশে প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে, যার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ব্যাখ্যা, অনুমান আর অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। কোনো একটি পোস্ট, ভিডিও কিংবা কারও বক্তব্য মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু ঘটনার সব দিক জানা বা তথ্য যাচাই করার আগেই আমরা অনেক সময় নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

এ ধরনের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কোনো ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ব্যাখ্যা, অনুমান এবং অভিযোগ দাবানলের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর মানুষ তখন বাছ-বিচার না করে, অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতেই নিজে নিজেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

একসময় ছিল মিডিয়া ট্রায়াল—রায়ের আগে গণমাধ্যমই যেন বিচার করে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলতো। এখন সেই বিচার আরও দ্রুত, আরও নির্মম। এর নাম সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল—যেখানে একটি পোস্ট, একটি ভিডিও কিংবা একটি গুজবই যথেষ্ট; সত্য যাচাইয়ের আগেই তৈরি হয়ে যায় জনতার রায়।

এখানেই আমাদের সময়ের অন্যতম বড় সংকট—ফেইক নিউজ ও মিস-ইনফরমেশন-এর মহামারি।

গুজবের গতি, সত্যের পরীক্ষা

ডিজিটাল যুগে তথ্য ছড়ানোর জন্য এখন আর বড় কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন নেই। একটি স্মার্টফোন, একটি ফেসবুক একাউন্ট এবং কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। যে কেউ যে কোন স্থানে বসে যে কোন তথ্য প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তথ্য যত সহজে প্রকাশ করা যায় তার সাথে পাল্লা দিয়ে সমানতালে বাড়েনি তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস।

রিউমার স্ক্যানার-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩,২১০টি মিস-ইনফরমেশন-এর ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৯ শতাংশ বেশি। এসব ঘটনার মধ্যে ফেসবুকে ২,৮২২টি এবং টিকটকে-এ ৬০০টি শনাক্ত হওয়ার তথ্যও তাদের প্রতিবেদনে রয়েছে। একই সময়ে ৩৮টি ডিপফেইক-প্রযুক্তিনির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান কিন্তু সারা দেশের সব ভুয়া তথ্যের পূর্ণাঙ্গ হিসাব হিসেব না -  এগুলো শুধুমাত্র একটি ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার শনাক্ত করা ঘটনার সংখ্যা, যা আসলে খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ। কিন্তু তারপরও প্রবণতাটি আমাদের সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট।

সমস্যা হলো, একটি মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়তে যে সময় লাগে, সেটি যাচাই করে সংশোধনী প্রকাশ করতে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই সময়ের মাঝেই মানুষের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায়, ব্যক্তির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামাজিক উত্তেজনা বাড়ে, এমনকি বাস্তব জীবনেও তার পরিণতি দেখা দিতে পারে।

মিথ্যা তথ্যের সংক্রমণ ঘটে একটি ‘শেয়ার’ বাটনের মাধ্যমে, কিন্তু তার ক্ষতি ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সমাজে।

রাড্ডা ক্লিনিক: একটি ঘটনা, বহু প্রশ্ন

মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা আমাদের আরও একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবকাঠামো ও চিকিৎসা-সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়।

এ ধরনের ঘটনায় জনসাধারণের ক্ষোভ ও উদ্বেগ স্বাভাবিক। কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে—কোনো ঘটনার প্রতিবাদ করা এবং যাচাইহীন তথ্য প্রচার করা এক বিষয় নয়। অভিযুক্তের পরিচয়, ঘটনার উদ্দেশ্য কিংবা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অপ্রমাণিত দাবি ছড়ালে প্রকৃত তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এখানে রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। প্রকৃত তথ্যের শূন্যতা যত দীর্ঘ হবে, অনুমান ও গুজবের জায়গাও তত বড় হবে।

এআই-এর যুগে চোখের দেখাও কি যথেষ্ট?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন বাস্তব মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে অডিও তৈরি, পরিচিত ব্যক্তির মুখ বসিয়ে ভিডিও বানানো কিংবা পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আগের তুলনায় অনেক সহজ।

ফলে একটি ভিডিও দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। আবার এআই দিয়ে তৈরি হয়েছে বলেই কোনো কনটেন্টকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা বলাও ঠিক নয়। প্রয়োজন উৎস যাচাই, প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।

এখানে প্রযুক্তিই হতে পারে সমাধানের অংশ। এআই -ভিত্তিক অ্যানামলি ডিটেকশন,  রিভার্স ইমেজ সার্চ, ভয়েস অ্যানালাইসিস, এবং অটোমেটেড ফ্যাক্ট চেকিং সম্ভাব্য বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। সিটুপিএ-এর মতো কন্টেন্ট প্রিভেনশন স্ট্যান্ডার্ড ছবি ও ভিডিওর উৎস এবং সম্পাদনার ইতিহাস যাচাইয়ে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তি শতভাগ নির্ভুল নয়; মানবিক যাচাই ও প্রাসঙ্গিক বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য।

বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

আমাদের ফেইক নিউজ মোকাবিলার কৌশলকে শুধু পোস্ট সরানো কিংবা ঘটনার পর প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ন্যাশনাল ইনফরমেশন ইন্টেগ্রিটি ফ্রেমওয়ার্ক ।

প্রথমত, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সহজে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা।

দ্বিতীয়ত, ‘ব্রেকিং নিউজ’-এর দৌড়ে সবার আগে খবর দেওয়ার তাড়নায় সংবাদমাধ্যম যেন কোনোভাবেই তথ্যের নির্ভুলতাকে বিসর্জন না দেয়।

তথ্যের উৎস যাচাই, একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং ‘ফ্যাক্ট, এলিগেশন এবং অপিনিয়ন’ স্পষ্টভাবে আলাদা করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে সন্দেহজনক কনটেন্ট শনাক্তকরণ, কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং এআই জেনারেটেড কিংবা ম্যানিপুলেটেড কন্টেন্ট-এর যথাযথ লেবেলিংয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তবে এসব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, আপিলের সুযোগ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি-কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারা আর প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যাচাই করতে পারা এক বিষয় নয়। নাগরিকদের শেখাতে হবে – সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পোস্ট দেখা মাত্রই বিশ্বাস করে শেয়ার করে ফেলতে নেই। বরং প্রতিটা পোস্টকেই প্রথমে দেখতে হবে অবিশ্বাসের নজরে। তারপর করতে হবে ফ্যাক্ট চেকিং। এবং এরপর শেয়ার- তার আগে নয়।   আর এই ফ্যাক্ট চেকিং-এর জন্য দরকার কীভাবে উৎস পরীক্ষা করতে হয়, পুরোনো ছবি শনাক্ত করতে হয় এবং আবেগপ্রবণ শিরোনামের আড়ালে থাকা বাস্তবতা বুঝতে হয়- এসব নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা ও শিক্ষা ।

শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব আমাদের সবার

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের প্রাচুর্য আছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্যের নিশ্চয়তা সব সময় নেই। তাই ফেইক নিউজ-এর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের নয়, শুধু সাংবাদিকদেরও নয়। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং প্রত্যেক ব্যবহারকারীর এখানে ভূমিকা রয়েছে।

একটি সহজ অভ্যাস দিয়েই পরিবর্তন শুরু হতে পারে: পজ  চেক, ভেরিফাই এবং শেয়ার।

খবরটির উৎস কী? অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম কি একই তথ্য দিয়েছে? ছবিটি কি সত্যিই এই ঘটনার? বক্তব্যটি কি প্রমাণিত তথ্য, নাকি কারও অভিযোগ?

উত্তর না জানা থাকলে শেয়ার না করাই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

একটি ক্লিক করতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। কিন্তু সেই ক্লিকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্যের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, এআই কিংবা স্মার্ট প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে আমরা কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য তৈরি, যাচাই ও ব্যবহার করতে পারছি তার ওপরও।

কারণ ডিজিটাল যুগে তথ্য শুধু শক্তি নয়—নির্ভরযোগ্য তথ্য একটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

 

লেখক: ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সরকারি খাতের সংস্কারবিষয়ক নীতি বিশ্লেষক