মেরিটোক্রেসির জনপ্রশাসন কতদূর?

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের অন্যান্য খাতের মতো জনপ্রশাসনেও বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগের অংশ হিসেবে দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ড. মো. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশন চার মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে দুই শতাধিক সুপারিশ করে কমিশন। তবে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে খোদ তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারই ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান বিএনপি সরকারও জনপ্রশাসন সংস্কারে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তবে বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয়। তাই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করে জনপ্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। যদিও সরকারের মেয়াদ সাত মাস অহিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না।

জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল মূলত রাষ্ট্রের পুরোনো কাঠামো বদলে প্রশাসনকে জনবান্ধব, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। কিন্তু সংস্কারের রূপরেখা তৈরি হওয়ার পরও বাস্তবে প্রশাসনের কাঠামো ও সেবা প্রদানের পদ্ধতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে সাধারণ মানুষ, কমিশনের সদস্য, সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসা তিন প্রতিবন্ধকতা— দলীয়করণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির মতো দীর্ঘদিনের চর্চা বর্তমান সরকারকে এখনো মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য ২৬টি সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠন করা হলেও বাংলাদেশে এখনো গতানুগতিক জনপ্রশাসনব্যবস্থা বহাল রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দলটি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের অঙ্গীকার করেছে। এর মানে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি। মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনীতিকীকরণের কারণে জনপ্রশাসনে মেধা ও দক্ষতার গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন-পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার স্থান নিয়েছে দলীয় আনুগত্য ও চাটুকারিতা। কেন্দ্রীভূত ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে জনপ্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি এবং সুবিধা পেয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার পরিচালনার দোসরে পরিণত হয়েছিলেন। এ কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত কমিশন জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর বেশকিছু কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে। জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ও বিপরীতমুখী মতামতও রয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও মনে করে, বিগত দিনগুলোতে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্ব বৃদ্ধি ও দলীয়করণ রোধ করতে হবে। এ কারণেই ব্যক্তির বিশ্বাস, অবিশ্বাস এবং দলীয় আনুগত্যকে বিবেচনায় না নিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে কেবল সততা, দক্ষতা, মেধা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার বিচারক্ষমতার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ এবং সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা ইশতেহারে উল্লেখ করেছে বিএনপি। সেখানে আরো বলা হয়েছে, দক্ষ, মেধাবী, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যথাযথ সংস্কার করা হবে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে। সংবিধানের আলোকে একটি যথোপযুক্ত সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনের সব পর্যায়ে ই-গভর্নেন্স চালুর কথাও বলা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে তত্কালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। চার মাসের মধ্যে কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা কমানো, সমপ্রকৃতির মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে ভাগ করা, নতুন দুটি বিভাগ গঠন, দেশকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা, রাজধানীর জন্য পৃথক সরকারব্যবস্থা, ডিসি ও ইউএনওর পদবি পরিবর্তন, সিভিল সার্ভিস পুনর্গঠন, বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি প্রথা বাতিল, মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে সচিব নিয়োগ, উপসচিব পদে পদোন্নতিতে কোটা পুনর্বিন্যাস এবং ন্যায়পাল নিয়োগসহ দুই শতাধিক সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের প্রতিবেদনটি ১৭টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ছিল। বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সুপারিশগুলোকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে ভাগ করা হয়। স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ছয় মাস এবং মধ্যমেয়াদি সুপারিশের জন্য এক বছর। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের নিজস্ব জরিপেও প্রশাসনের চিত্রের একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। জরিপে ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ জনপ্রশাসনে সংস্কারের পক্ষে তাদের মত দিয়েছিলেন। ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন জনপ্রশাসন ব্যবস্থা জনবান্ধব নয়। কিন্তু এরপরও সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সেটা কমিশন গঠন করা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও নয়, এমনকি বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসেও নয়।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেছেন, জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য খুব শিগগির নতুন কমিশন গঠন করা হবে। তিনি বলেন, প্রশাসনকে দলীয়করণের প্রভাব থেকে বের করে আনতে সরকার কাজ করছে। কমিশন গঠনের আগে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের ‘ভূত’ পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে। গত ১৭ আগস্ট সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। উপদেষ্টা বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বরং সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সেটিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। খুব শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। কমিশন গঠনে কিছুটা বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যে সংস্কার কমিশন আমরা করতে চাই, কিন্তু সেই সংস্কার কমিশনকে যারা সাপোর্ট করবে, সেখানে যদি ভূত থাকে, এগুলো ক্লিয়ার না করলে পরে ভালো কাজ হবে না।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে, এটা একেবারে নিম্নমানের। এটাতে বাস্তবায়ন করার মতো কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। এককথায় পুরো রিপোর্টটি অপ্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকার তাদের ইশতেহার অনুযায়ী আরেকটা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করলে ভালো হবে। সে কমিশন বিস্তর পর্যালোচনা করে বাস্তববাদী একটা রিপোর্ট দিবে। এর মধ্যে কিছু সুপারিশ বের করে আনতে হবে। যা বাস্তবায়ন হলে দেশ ও জনগণের জন্য ভালো কিছু হবে। জনপ্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও উপকৃত হবে, সর্বোপরি মেধাভিত্তিক যোগ্য, দক্ষ, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক একটা প্রশাসন গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করি।