এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।...
-সুকান্ত ভট্টাচার্য
এই কবিতার রেশ ধরেই বলি, শিশুর জন্য একটা বাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী চাই। যেখানে কোনো শিশু অনাহারে থাকবে না; বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার অভাবে অকালে ঝরে পড়বে না; বঞ্চিত হবে না শিক্ষার আলো থেকে। কিন্তু তাদের জন্য এমন বাসযোগ্য পৃথিবী কি আমরা গড়তে পেরেছি? রক্ষা করতে পেরেছি কি তাদের অধিকার? এই প্রশ্নটি এখন আমাদের সবার সামনে।
পরিবার হলো শিশুর প্রাথমিক পাঠশালা। মা-বাবা তার প্রথম আদর্শ। বাবা-মা’র জীবনাচরণ শিশুর আচরণ ও গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে পরিবার থেকেই শুরু করতে হয় সঠিক পরিচর্যা। বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যদেরও হতে হয় তার প্রতি বিশেষ মনোযোগী। ছোট বলে অনেক সময় আমরা তাদের গুরুত্ব দিই না, গ্রাহ্য করি না তাদের মতামত। এটা শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তার চিন্তা ও মতামতকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। তার কথা যৌক্তিক না হলে, তাকে গঠনমূলকভাবে বোঝাতে হবে। নিজের কোনো সিদ্ধান্ত তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন বা ইচ্ছাগুলো সন্তানকে দিয়ে পূরণ করার চিন্তা অবাস্তব।
শিশুরা খেয়ে পরে বাঁচলেই বলা যাবে না তাদের জীবন নিরাপদ ও সুন্দর। মৌলিক চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ বিনোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি সে যেন অন্যান্য বই পড়তে পারে, শিশুসাহিত্যের আনন্দ নিতে পারে; মজার সব শিশুতোষ চলচ্চিত্র, কার্টুন, নাটক ইত্যাদি দেখতে পারে; সে ব্যবস্থা পরিবার থেকেই করতে হবে। শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়- এমন সব আয়োজন করতে হবে। সর্বোপরি সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য তাকে একটা অনুকূল পরিবেশ দিতে হবে।
শিশুর শারীরিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। খেলাধুলা শিশুর শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি একতা, সম্প্রীতি, সামাজিকতা ও নেতৃত্বের গুণকে বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দিন দিন কমে আসছে খেলার মাঠ। শিশুরা যে উন্মুক্ত কোনো স্থানে দৌড়ঝাঁপ করবে, বিভিন্ন ধরনের খেলা খেলবে- তার ব্যবস্থা সীমিত হয়ে আসছে। শহরে তো শিশুদের জন্য খেলার মাঠই নেই। বিদ্যালয়গুলোও খুব স্বল্প পরিসরের মধ্যে গড়ে ওঠে। সেখানে প্রাণ খুলে একটু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ নেই। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে, পাড়ায়, মহল্লায় শিশুদের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই।
জন্মগতভাবেই শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। কোনো একটি বিষয় তাদের মাথায় ঢুকে গেলে তা থেকে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন। তাই তাদের সামনে এমন কোনো নেতিবাচক আচরণ করা যাবে না, যা তাকে প্রভাবিত করে। কারণ শিশুরা তখন ওই কাজটিই ঘুরে ফিরে করতে চায়। ওদের সামনে কথা বলা উচিত ভেবে-চিন্তে। আজকাল শিশুরা প্রযুক্তির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ছে। মা-বাবা ও অভিভাবকদের এ ক্ষেত্রে সচেতন থাকা জরুরি। শিশুদের সামনে স্মার্টফোনে গেম খেলা বা ভিডিও দেখা থেকে বিরত থাকা উচিত। আপনি নিজে স্মার্টফোনে আসক্ত হলে সন্তানও আসক্ত হয়ে পড়বে। আপনার নিষেধ তার ওপর মোটেই কাজ করবে না; বরং এটা আপনার স্ববিরোধী আচরণ হিসেবে গণ্য হবে তার কাছে। শিশুরা কাদামাটির মতো। তাদের যে ছাঁচে গড়া হবে, সেই ছাঁচেই বেড়ে উঠবে। তাদের সামনে শুভ ও সুন্দর বিষয়গুলোকে বেশি বেশি উপস্থাপন করা উচিত। তাদেরকে বইপড়ায় উৎসাহিত করতে বাবা-মাকেও বই পড়তে হবে। শৈশব থেকেই এই সুন্দর অভ্যাসটি চর্চা করলে তার প্রভাব থাকবে সারাজীবন।
শিশুরা পশুপাখিদের খেলার সঙ্গী ভাবে। শিশুদের সামনে পশুপাখির প্রতি খারাপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণে তাদের উৎসাহী করতে হবে। এতে শিশুদের সংবেদনশীল একটা মন গড়ে উঠবে। তাদের মধ্যে মানবিক বোধগুলো তীব্র হবে। সবার জন্য তৈরি হবে ভালোবাসা। এ ছাড়া শিশুদের হাত দিয়ে গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যে হারে বন ধ্বংস হচ্ছে, যেভাবে বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের, তাতে আমাদের শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। গাছ লাগানো এবং পরিবেশ রক্ষার মতো সুন্দর বিষয়গুলোর সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটাতে হবে।
অভিভাবকদের সপ্তাহে অন্তত একটা দিন শিশুদের জন্য হাতে রাখা উচিত। যাতে সবাই মিলে কোথাও থেকে ঘুরে আসা যায়। এতে শিশুরা ভ্রমণের প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠবে। যত ভালো ভালো কাজের সঙ্গে তাদের যুক্ত রাখা যাবে, তাদের ব্যক্তিত্বও তত উত্তম রূপে গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস ওদের জানাতে হবে। জানাতে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা। তাহলে তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হবে। শুধু তাই নয়, আমাদের শিশুদের পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কেও জানাতে হবে। বিজ্ঞান চর্চায় তাদের উৎসাহিত করতে হবে, গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আমাদের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করানো মানে শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করানো। আমাদের যে একটা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে, এটা শিশুদের অনুভবে আনা প্রয়োজন।
শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাড়েনি শিক্ষার গুণগত মান। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে থামেনি বিতর্ক। পাঠ্য বইয়ের বিষয়বস্তু পাল্টে যায় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে। ফলে শিশুরা বারবার বিভ্রান্তির শিকার হয়। যে শিক্ষা শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত গড়ে দেবে, সেই শিক্ষা যদি রাজনীতিমুক্ত না হয়, তা হলে আমাদের আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন ও সহিংসতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। শিশু নির্যাতনের এই ভয়াবহতা গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। এমনকি নিজের ঘরও শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। এসব সহিংসতার হাজারো ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায় বরাবরই। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও আন্তরিক মনোযোগ। শিশুদের মধ্যে গুড টাচ ও বেড টাচ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিশু নির্যাতন রোধে সরকারকে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বৃদ্ধি ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে।
শিশুদের মধ্যে রয়েছে ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু’। এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা কি তাদের মৌলিক অধিকারগুলো যথাযথ পাচ্ছে? ওদের জন্য সারা দেশে কয়টি স্কুলই-বা রয়েছে? এই শিশুদের অনেকের মধ্যে বিশেষ ক্ষেত্রে রয়েছে নানাবিধ প্রতিভা। কিন্তু যথাযথ মূল্যায়ন ও যত্নের অভাবে তারা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায় না, পারে না তাদের সক্ষমতাকে প্রকাশ করতে। তারা সমাজ বা পরিবারে একরকম বোঝা হয়ে আছে। সঠিক পরিচর্যা ও ভালোবাসাই পারে তাদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করতে।
বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করে। কিন্তু এ যাবৎ শিশুদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ শিশু রয়েছে (০-১৭ বছর বয়সী)। এর মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। এদের মধ্যে রয়েছে অনাথ শিশু, শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু, পথশিশু, বাল্যবিবাহের শিকার শিশু এবং পাহাড়, চর বা দুর্গম এলাকায় বসবাসরত শিশু। এসব সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক শিশুর জীবনমান উন্নয়নে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি শিশু অধিকারের বিষয়টি সামাজিকভাবে চর্চায় আনতে হবে।
শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণসহ তার নিরাপত্তা বিধান, মেধা বিকাশ, তার সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবারকে যেমন সচেতন হতে হবে; তেমনি ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সুরক্ষামূলক আইনের মাঠপর্যায়ে বাস্তব প্রয়োগ আরো জোরদার করতে হবে। আগামী দিনের সুন্দর জাতি গঠনের সমস্ত উদ্যোগ যেন কেবল সভা-সেমিনার আর কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, চাই তার যথাযথ বাস্তব প্রতিফলন। শিশুদের অংশগ্রহণে, তাদের মতামতের ভিত্তিতে শিশু বাজেট প্রণয়ন বাঞ্ছনীয়। এছাড়া শিশু বাজেটে বরাদ্দ আরো বাড়াতে হবে। শিশুরা কী চায়, কী করলে তাদের জীবন আরো আনন্দময় ও সুন্দর হয়ে উঠবে, তা কেবল শিশুরাই জানে। তাই, শিশুদের সমস্যা সমাধানে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে টেকসই সমাধান সম্ভব। এছাড়া, শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, মিডিয়াসহ সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ খুবই জরুরি।
বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার রক্ষায় সেভ দ্য চিলড্রেন-সহ আরো বেশ কিছু শিশু অধিকার সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। শিশুদের সামগ্রিক কল্যাণে একটি শিশু অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। আমরা তাকিয়ে আছি- দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু অধিকার বাস্তবায়নে সারা বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। আজকের এই শিশুদের মধ্য থেকেই একদিন বের হয়ে আসবে ভবিষ্যতের শেখ মুজিব, রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, নিউটন, কার্ল মার্ক্স, বেগম রোকেয়া, মাদার তেরেসার মতো মনীষীরা। সুতরাং তাদের বেড়ে ওঠা কণ্টকমুক্ত ও আনন্দময় করে তোলার ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই।
লেখক : গণমাধ্যম কর্মী