১. পরিবারের সবচেয়ে ছোটজন, আয়মান, দূরের প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ায় এডমন্টন শহরে আমাদের বাসাটা হঠাৎই ফাঁকা হয়ে গেল। ওকে আমরা আদর করে ‘বেবি’ বলে ডাকি। তিনতলার বাসায় কখনো বেইজমেন্টে, কখনো মেইন ফ্লোরে, কখনোবা ওপরের তলায় - সারাক্ষণই ঘুরে বেড়াত সে। আর আমরা, মা-বাবা মিলে, কারণে-অকারণে তাকে ‘বেবি’ বলে ডাকতাম। কী সুন্দরই না ছিল সেই দিনগুলো!
প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে অন্টারিও প্রদেশের ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বড়ো ভাই সাঈদের সাথে আয়মান উড়াল দিল মধ্যরাতে। তাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে বাসায় ফিরে সেদিন রাতে ঘুম বলতে তেমন কিছুই হয়নি। আয়মান ওখানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে।
আলবার্টা প্রদেশের লেথব্রিজ শহরের বাসিন্দা আমার বুয়েটের বন্ধু মহসিন কবির বেশ কিছুদিন ধরেই সপরিবারে তাদের বাসায় বেড়াতে যেতে বলছিল। আয়মানের চলে যাওয়ায় আমার মন খারাপ দেখে আমার সহধর্মিণী বলল, ‘চলো, মহসিন ভাইয়ের ওদিক থেকে ঘুরে আসি; ভাই-ভাবি কতবারই না তোমাকে তাদের ওখানে যেতে বলেছেন। আমার তো মনে হয়, এটাই মোক্ষম সুযোগ - একদিকে নতুন একটা শহর ঘুরে দেখা হবে, অন্যদিকে মনটাও খানিক চাঙ্গা করা যাবে।’
বিদুষী সহধর্মিণী হালিমা আফরিনের কথাটা মনে ধরল। দেরি না করে বন্ধুকে ফোন দিলাম। ফোন ধরলেন আমাদের প্রিয় শিখা ভাবি, বন্ধুর স্ত্রী। কুশল বিনিময়ের পর ভাবি ফোন দিলেন মহসিনকে।
বন্ধু শুনল আমাদের ‘বেবি’র বাসা ছেড়ে যাওয়ার কথা। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আমার এই বন্ধুটি সরকারি চাকরি করে। তাই, ছুটি নেওয়া তার জন্য খুব কঠিন কিছু নয়। সে বলল, ‘এক্ষুনি রওনা দাও। আমি আজ ছুটি নিয়ে নিচ্ছি। তোমার ভাবিও ছুটি নেবে। চলে এসো দ্রুত।’
শিখা ভাবি ওদের শহরের সবচেয়ে বড় ওয়ালমার্ট স্টোরের একটি বিভাগের ম্যানেজার। কর্মক্ষেত্রে তাঁর পরিচয় মনোয়ারা নামে।
২.আমার বাসা থেকে ক্যালগেরি ট্রেইল নামের হাইওয়ে ধরে সোজা চলে যাওয়া যায় লেথব্রিজ। গাড়িতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ।
দুপুরের হালকা খাবার সেরে আমি আর আমার সহধর্মিণী যাত্রা শুরু করলাম আমাদের টয়োটা হাইল্যান্ডার গাড়িতে। বছর দশেক আগে গাড়িটি কিনেছিলাম। জ্বালানি একটু বেশি খরচ হলেও বেশ নির্ভরযোগ্য; দীর্ঘ যাত্রার জন্য বেশ উপযোগী। গাড়িতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে আমরা রওনা হলাম।
ক্যালগেরি ট্রেইল নামের মহাসড়ক ধরে প্রায় এক ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর গুগল ম্যাপ তুলনামূলক দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অন্য একটি রাস্তা দেখাল। ক্যালগেরি ট্রেইল ছেড়ে সেই রাস্তা ধরলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, এটি একটি আনডিভাইডেড (অবিভক্ত) হাইওয়ে, অর্থাৎ বিপরীতমুখী গাড়ির লেনের মাঝে কোনো বিভাজন নেই। ফলে চোখ-কান খোলা রেখে খুব সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে, যাতে ভুল করে বিপরীতমুখী লেনে ঢুকে না পড়ি। আগে বুঝতে পারলে হয়তো কয়েক মিনিট বেশি সময় লাগলেও ক্যালগেরি ট্রেইলেই থাকতাম। যাক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। মহাসড়কে উঠে আফসোস করার সুযোগ নেই। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে চললাম।
এখন সেপ্টেম্বর মাস। বাতাসে গ্রীষ্মের উষ্ণতার সঙ্গে শরতের হালকা ঠান্ডা মিশে আছে। সূর্যের প্রখর আলো শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের গাড়ি যখন এডমন্টনের ব্যস্ত এলাকা পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে দক্ষিণের পথে এগিয়ে যেতে শুরু করল, মনে হলো আমরা যেন পরিচিত পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি।
বড় বড় ভবন আর তেমন চোখে পড়ছে না। নগরের কোলাহলও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। রাস্তার দুই পাশে কেবল খোলামাঠ, কৃষিভূমি আর প্রেইরি তৃণভূমি। মাঝেমধ্যে জানালার বাইরে তাকাই আর ভাবি - আলবার্টা নামের এই বিশাল প্রদেশের যে শহুরে জীবনে আমরা অভ্যস্ত, তার বাইরেও কি এমন বিস্তীর্ণ এক জগৎ ছড়িয়ে আছে দূর-দূরান্তে?
যতদূর চোখ যায়, কেবল সবুজ আর সোনালির খেলা। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ ক্ষেত। কোথাও সদ্য কাটা ফসলের মাঠ, কোথাও দু-চারটি গরু ঘাস খাচ্ছে, দূরে কোথাও ফার্মহাউস, শস্যাগার। কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছে।
বছরের এই সময়ে ল্যান্ডস্কেপে গ্রীষ্ম আর শরতের মিশ্রণ থাকে। কোথাও কোথাও গাছের পাতায় হলুদের ছোঁয়া লাগলেও বেশিরভাগই এখনো সবুজ। তবে ঘাসের প্রায় পুরোটাই সূর্যের আলোয় সোনালি হয়ে উঠেছে। নগরজীবনের ব্যস্ততা ছেড়ে মহাসড়কে বেরিয়ে না পড়লে এমন মনোরম দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। শহরে আমরা হয়তো ভবনের ঘনত্ব কিংবা উচ্চতা দিয়ে জায়গার পরিমাপ করি; আর এখানে জায়গার বিশালত্ব বোঝা যায় দূরের আকাশ আর দিগন্ত দিয়ে।
লং ড্রাইভে গেলে সচরাচর দুই ঘণ্টা পরপর বিরতি নিই। কিন্তু এবারের ভ্রমণে আরেকটু ঘন ঘন বিরতি নিতে হয়েছে। কারণ, গত বছর ঘটে যাওয়া এক গাড়ি দুর্ঘটনা এখনো স্মৃতিতে জেগে আছে।
আগেই বলেছি, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর আশায় ক্যালগেরি ট্রেইল ছেড়ে আনডিভাইডেড হাইওয়ে বেছে নিয়েছিলাম। ফলে বিপরীতমুখী গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে রাস্তার ওপর বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। পথে প্রায় ছয় ঘন্টা পার করে অবশেষে লেথব্রিজে বন্ধু মহসিনের বাসায় পৌঁছালাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা।
৩. আশির দশকের সেই ১৮ বছর বয়সে মহসিনকে বুয়েটে ক্লাসমেট হিসেবে পেয়েছিলাম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একই সেকশনে তো বটেই, এমনকি আমাদের রোল নম্বরও ছিল কাছাকাছি। তাই ছাত্রজীবনে অনেক প্রজেক্টেও একসঙ্গে কাজ করেছি।
বরাবরই তাকে খুব চুপচাপ স্বভাবের জ্ঞানী মানুষ হিসেবে দেখে এসেছি। আজও সে তেমনই আছে। সে তুলনায় শিখা ভাবি অনেক বেশি চটপটে এবং আড্ডা জমিয়ে রাখার মতো মানুষ।
তাদের দুই কন্যার বড়জন মেহরীন কিছুদিন আগে লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছে। কানাডায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও তার আদবকায়দা আর বাচনভঙ্গি দেখে মনে হবে না, এই তরুণী বাংলাদেশে বড় হয়নি। ছোট মেয়ে মালিহা পাশের শহর ক্যালগেরিতে প্রকৌশলশাস্ত্রে পড়াশোনা করছে।
শিখা ভাবির মা-বাবা কয়েক বছর আগে কানাডায় অভিবাসন নিয়ে এসেছেন। থাকেন মেয়ের সঙ্গেই। তাঁরাও এসে আমাদের সঙ্গে গল্পে যোগ দিলেন।
আলাপের শুরুতেই খালুজান আমাকে বললেন, ‘বাবা, তোমার কথা ওদের মুখে অনেক শুনেছি। তোমার লেখা বইও আমাদের বাসায় আছে। আজ তোমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’
খালাম্মাও বেশ আলাপী মানুষ। তাঁর হাতে পানের বাটা দেখে আমার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল। কথায় কথায় খালাম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘খালাম্মা, আপনি দিনে কয় খিলি পান খান?’
- তা কি আর হিসাব করে খাই বাবা! যখন মন চায়, খাই।
শিখা ভাবি তখন ড্রইংরুমের জানালার পাশে থাকা একটি লতার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন, ‘ওই যে লতা দেখছেন, সেটি পানগাছ। এক ভাবি দেশে গেলে কয়েকটি পানের চারা এনেছিলেন। আমাকে একটি দিয়েছেন।’
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘খালাম্মার পান কি তবে ওই লতা থেকে?’
বেকুবের মতো প্রশ্ন করেছি দেখে সবাই হেসে উঠলেন। কারণ, ওই ছোট্ট লতা এত পান দেবে কোথা থেকে!
খালাম্মাকে আমার মরহুম মায়ের কথা মনে করিয়ে দিলাম। বললাম, ‘জানেন খালাম্মা, বেশি বেশি পান খাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত খাদ্যনালির ক্যান্সারে আমার মা পরপারে চলে গেলেন।’
এরই মধ্যে বন্ধুর বাসার কলিং বেল বেজে উঠল। আমাদের চেয়ে বয়সে সিনিয়র, হাস্যোজ্জ্বল এক দম্পতি বাসায় প্রবেশ করলেন।
বন্ধু মহসিন তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইনি আমাদের বাসু ভাই, যাঁর মূল নাম ড. সামসুল আলম। লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। তুমি আমার এখানে আসার খবর শেয়ার করার পর ভাই তোমার সঙ্গে গল্প করতে আগ্রহ দেখালেন। তাই তাঁদের ডেকেছি।’
বাসু ভাইয়ের স্ত্রী, মানে, ভাবীর নাম মরিয়ম। বেশ পর্দানশীন মনে হলো তাঁকে। কথাও বলেন বুঝেশুনে।
বয়সের হিসেবে বাসু ভাই আমি বা মহসিনের প্রায় এক যুগের সিনিয়র। কিন্তু তাঁকে দেখে আমাদের কাছাকাছি বয়সেরই মনে হয়। মুখমণ্ডলেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট নয়।
ভাইকে খুব ইজি-গোয়িং ও আলাপপ্রিয় মনে হলো। লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ফাইন্যান্স পড়ান। মনে মনে ভাবি, সম্পর্ক আরো খানিকটা জমে উঠলে তাঁর কাছ থেকে চেহারা-সুরতে তারুণ্য ধরে রাখার কিছু টিপস নিয়ে নিতে হবে। খুব অল্প সময়ে আমরা যেভাবে ঘনিষ্ঠ হলাম তাতে বন্ধুতায় বয়স কোন সমস্যা নয় বলেই মনে হলো।
৪. এবার শুনুন বাসু ভাইয়ের লেথব্রিজে আগমনের কাহিনি।
দেশে থাকতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন বাসু ভাই। আশির দশকের গোড়ার দিকে দেশ ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমান। ১৯৮৬ সালে কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে লেথব্রিজে আসেন। অর্থাৎ, লেথব্রিজে তাঁর চার দশক পেরিয়ে গেছে।
তিনি জানালেন, তখনকার লেথব্রিজ অনেকটা বিরানভূমির মতো ছিল। হাতেগোনা কিছু বাড়িঘর, মানুষও ছিল অনেক কম। বাংলাদেশি পরিবার তাঁরাই প্রথম। তাঁরা লেথব্রিজে আসার কয়েক বছরের মধ্যে আরও সাত-আটটি বাংলাদেশি পরিবার এসে যোগ দেয়।
বাসু ভাইয়ের মতে, বর্তমানে লেথব্রিজে বাংলাদেশির সংখ্যা শদুয়েক বা তার কিছু বেশি হতে পারে। লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিসহ আরও চার-পাঁচজন বাংলাদেশি অধ্যাপনা ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। এ ছাড়া পেশাজীবী, যেমন প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্ট, আছেন কয়েকজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বেশ কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীও আছেন এই শহরে। বছরে এক-দুবার তাঁরা শহরের কোথাও একসঙ্গে মিলিত হন।
বন্ধু মহসিনের পরিবার, খালা-খালু, আর বাসু ভাইয়ের পরিবার - সবাই মিলে রাত একটা পর্যন্ত আড্ডা হলো। ভাতিজি মেহরীন তার নানীর সহায়তায় এরই মধ্যে কয়েকবার চা বানিয়ে খাওয়াল আমাদের। এমন প্রাণখোলা আড্ডা সেই কবে দিয়েছি, ঠিক মনে নেই।
বাসু ভাই ও ভাবী তাঁদের বাসায় ফিরে যাওয়ার আগে পরদিন সন্ধ্যায় তাঁদের বাসায় চা পানের দাওয়াত দিয়ে গেলেন। তাঁদের বাসা মহসিনদের বাসা থেকে দশ-বারো মিনিটের ড্রাইভিং দূরত্বে।
আমরা ঘুমাতে যাওয়ার আগে শিখা ভাবী জানতে চাইলেন সকালে আমরা সচরাচর কী খাই। আমার স্ত্রী বললেন, ‘ভাবি, আমরা ব্রেকফাস্টে কার্বোহাইড্রেট খাই না। মানে রুটি, পরোটা, এসব দরকার নেই।’
ভাবি বললেন, ‘এ কী কথা! আপনাদের জন্য তো আমার আম্মু আগে থেকেই পরোটা বানিয়ে রেখেছেন। তাহলে আপনারা কী খান বলেন তো?’
- দুটো করে ডিম আর এক কাপ চা। সকালে আর কিছু খাই না।
ভাবি বললেন, ‘ঠিক আছে, তাই হবে।’
৫. পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে নয়টা পেরিয়ে গেল। নিচে নেমে ডাইনিং টেবিলে দেখি ব্রেকফাস্টের বিশাল আয়োজন।
কী নেই সেখানে! দুটো করে ডিম, পরোটা, গরু ভুনা, মুরগি, খাসি, মিষ্টি, কয়েক প্রকারের ফল, আরও কত কী!
এত কিছুর পরও বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, তোমরা বেশি কিছু খাবে না বলায় সিম্পল ব্রেকফাস্ট তৈরী করলাম।’
ব্রেকফাস্ট সেরে বন্ধু আমাদের শহর ঘুরে দেখাতে বেরিয়ে পড়ল। ওয়াটারটন লেইক ন্যাশনাল পার্কে যাব কি না জানতে চাইলে সম্মতি দিলাম। সেভাবেই যাত্রা শুরু হলো।
যাত্রাপথে কথায় কথায় বন্ধু মহসিনকে জিজ্ঞেস করি, ‘কানাডার সব জায়গায় তো কমবেশি শীত আছে; লেথব্রিজের শীত তোমার কেমন লাগে?’
সে জবাব দেয়, ‘আলবার্টা প্রদেশে এডমন্টনের চেয়ে ক্যালগেরি কিছুটা উষ্ণ, আমার মনে হয় লেথব্রিজ ক্যালগেরির চেয়েও খানিক বেশি উষ্ণ। তাছাড়া শীতকালে এখানে কয়েকবার শিনুক (Chinook) আসে। ফলে, প্রখর শীতেও মনে হয় কিছু সময়ের জন্য সামার এসেছে।’
আমি বলি, ‘সে অর্থে এ শহরকে শিনুকের শহর বলা যায় কি?’
সে বলে, ‘হোয়াই নট?’
যারা জানেন না - শিনুক (chinook) হলো এক ধরণের উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাস, যা রকি পর্বতমালার পূর্ব ঢাল বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, বিশেষ করে কানাডার আলবার্টা ও আমেরিকার মন্টানায়। শীতের দিনেও এটি খুব দ্রুত তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে, সাময়িকভাবে মনে হতে পারে সামার (গ্রীষ্মকাল) এসে গেছে।
শহরের ভেতরেই প্রকৃতির একান্ত উপস্থিতি চোখে পড়ল ওল্ডম্যান রিভার ভ্যালি দেখে। লেথব্রিজের এই জায়গাটি যে কারও মনে গভীর ছাপ ফেলবে। নদীর তীর, সবুজ বনভূমি, খোলা ময়দান - সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের আকাশের নিচে কী এক অভূতপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করেছি, তা লিখে বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। উপরে শহর, নিচে ভ্যালি, আর তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে ওল্ডম্যান নদী। গাড়ি থামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমরা সবাই মনভরে উপভোগ করলাম সেই দৃশ্য।
পথিমধ্যে নৌকার মতো দেখতে এক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা দেখিয়ে বন্ধু জানাল সেটি লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশাল কংক্রিট স্ট্রাকচার, জ্যামিতিক ফর্ম এবং টেরেসড ডিজাইন, সব মিলিয়ে ভবনটির স্থাপত্য খুবই স্বতন্ত্র মনে হলো।
দূর থেকে দেখে মনে হলো, এটি যেন কেবল কিছু ভবনের সমষ্টি নয়; বরং ওল্ডম্যান রিভার ভ্যালি ও আশপাশের ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া এক অনন্য স্থাপত্যশোভা। ইচ্ছে করছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমে ঘুরে দেখি। কিন্তু সময়ের অভাবে তা আর সম্ভব হলো না।
৬. বন্ধুর বাসা থেকে ওয়াটারটন লেইক ন্যাশনাল পার্ক প্রায় দুই ঘণ্টার ড্রাইভ। গাড়ি চালাচ্ছিল বন্ধু মহসিন। ওর পাশের সিটে আমি, আর পেছনে আমাদের দুজনের সহধর্মিণীবৃন্দ।
আমরা দুই বন্ধু সামনের সারিতে বসে গল্প করছিলাম, আর ওরা দুজন পেছনে যার যার মতো গল্প করছিল। এরই মধ্যে শিখা ভাবী সঙ্গে আনা চায়ের ফ্লাস্ক থেকে আমাদের চা খেতে দিলেন।
বন্ধু গাড়ি চালাচ্ছিল বলে আমি বেশ রিল্যাক্সড মুডে বসে রাস্তার দুপাশের দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সোনালি রঙের জব গাছ দেখে আমার স্ত্রী প্রশংসা করতেই বন্ধু মহসিন ভুল সংশোধন করে বলল, ‘ভাবি, ওসব জবের চারা নয়, ঘাস।’
- 'ঘাস!' অবাক হয়ে আমি জানতে চাইলাম।
বন্ধু উত্তর দিল, ‘এখানে ঘাস বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লাগানো হয়। কোনো কোনো সময় বছরে তিনবার পর্যন্ত ঘাস লাগানো হয়। ঘাসের ব্যবসা বেশ লাভজনক।’
রাস্তার দুধারে কিছুদূর পরপর শুকনো ঘাসের বিশাল আকারের কিউব পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এগুলো সারা বছর পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।
নিজে গাড়ি চালাচ্ছিলাম না বলে সরাসরি রাস্তার ওপর ততটা নজর ছিল না। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। একপর্যায়ে গাড়িতে বসেই ঘুমিয়ে নাক ডাকতে শুরু করলাম। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না।
মহসিন আচমকা প্রশ্ন করে, ‘দোস্ত, প্রিয়ার সঙ্গে কি তোমার যোগাযোগ আছে?’
চোখ মুছতে মুছতে আলসেমির সঙ্গে উত্তর দিলাম, ‘বছরখানেক আগে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে একবার কথা হয়েছিল।’
- ভিডিও না অডিও?
- ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভিডিও ঠিক আছে কি না। ও বলেছিল, ভিডিও কাজ করছিল না।
এই প্রিয়া আমাদের বুয়েটের আরেক ক্লাসমেট, যাকে ইঙ্গিত করে ক্লাসের কিছু বন্ধু আমার সঙ্গে ঠাট্টা করত। বাস্তবতা হলো, আমাদের দুজনের মধ্যে সহপাঠীসুলভ বন্ধুত্বের বাইরে কিছুই ছিল না। বেশভূষায় ক্লাসের অন্য মেয়েদের চেয়ে প্রিয়া বেশ আধুনিক ছিল বলে সে সবসময়ই আলোচনায় থাকত। সে সময়ের তরুণী মেয়েটির দৃষ্টিতে ছিল সমুদ্রের গভীরতা, আর মনটা ছিল ভীষণ সরল। আমার লেখালেখি সে ভীষণ পছন্দ করে, আর সেটি জানাতেই মূলত সুদূর আমেরিকা থেকে আমাকে ফোন করেছিল সেদিন, এর অধিক কিছু না।
আমি নিশ্চিত, বন্ধু মহসিন আমার ঘুম ভাঙাতেই হঠাৎ আমাদের এই পুরোনো বন্ধুর প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিল।
ওদিকে শিখা ভাবীও মজার এক গল্প বললেন।
আমার স্ত্রী ভাবীর কাছে জানতে চাইলেন, তাঁর সুন্দর থ্রি-পিসটি কোথা থেকে কেনা।
উত্তরে ভাবি বললেন, ‘গতবার দেশে গেলে ঢাকার এক মার্কেট থেকে আমার এক ভাবীর সহায়তায় এটি কিনেছি।’
আমার স্ত্রী প্রশ্ন করলেন, ‘ভাবীর সহায়তা নিতে হলো কেন?’
শিখা ভাবী বললেন, ‘কারণ, আমি কানাডা থেকে গিয়েছি বললে সেলসম্যানরা নাকি সবচেয়ে ভালো ও দামি কাপড়গুলো দেখাতো না। তারা মনে করে, কানাডায় যারা থাকে তাদের হাতে তেমন টাকাপয়সা থাকে না।’
- ‘তাহলে কোন দেশে থাকি বলতে হবে?’ আমার স্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন।
- বাংলাদেশে। কারণ, বাংলাদেশে এদিক-ওদিক করে যত সহজে টাকা কামানো যায়, কানাডা-আমেরিকার মতো দেশে সেভাবে পারা যায় না। দোকানের সেলসম্যানরা এটা বেশ ভালোই জানে। তাই, সেলসম্যানের সঙ্গে কথা বলে ভাবিই দরদাম ঠিক করে কিনে দিয়েছেন।
বাস্তবে তো এর বিপরীত হওয়া উচিত ছিল - কানাডার এক ডলারে না বাংলাদেশের প্রায় একশ টাকা হয়ে যায়!
৭. একসময় রোড সাইন দেখে বুঝলাম, আমরা ওয়াটারটন লেইকে প্রবেশ করছি।
ওয়াটারটন লেইক ন্যাশনাল পার্ক কানাডার আলবার্টা প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। এখানে বিস্তীর্ণ প্রেইরি বা তৃণভূমি এসে রকি পর্বতমালার সুউচ্চ পাহাড়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পাহাড়, হ্রদ, জলপ্রপাত, গিরিখাত ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি এক চমৎকার গন্তব্য।
গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি।
পার্কের প্রবেশমুখে দায়িত্বে থাকা এক কর্মী হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে বললেন, ‘পার্কিংয়ের স্পট নাও পাওয়া যেতে পারে, তবে আপনারা ঘুরে দেখতে পারেন।’
ঘুরতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি স্পট পাওয়া গেল। গাড়ি রেখে আমরা সবাই সোজা লেইকের দৃশ্য উপভোগ করতে হাঁটতে লাগলাম।
সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝে নীল পানির বিশাল বিস্তার দেখে খানিকটা স্থির হয়ে গেলাম। দুধারে পাহাড়ে ঘেরা নীলাভ লেইকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, কোনো অভিজাত রাজপ্রাসাদের বিশাল খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য অবলোকন করছি। পাহাড়, জল আর আকাশের অপূর্ব মিতালিতে মুহূর্তটি যেন হয়ে উঠেছিল এক স্বপ্নিল ক্যানভাস।
এতক্ষণ লেথব্রিজের যে খোলা প্রেইরি (তৃণভূমি) ল্যান্ডস্কেপের মধ্য দিয়ে এসেছি, তার সঙ্গে এই লেইকের দৃশ্য একেবারেই আলাদা। এখানে চারপাশে পাহাড়; পাহাড়ের গায়ে বন, কোথাও পাথুরে ঢাল, আর এসবের মাঝখানে নীল হ্রদ। বছরের এই সময়ের পরিষ্কার আকাশে পানির রং গভীর নীল। সেই নীল জলে দূরের পাহাড়ের স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি যেন সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
এই মনোরম দৃশ্যের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত প্রিন্স অব ওয়েলস হোটেল। এটি একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটও বটে। আকাশচুম্বী পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক কাঠের এই হোটেল স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ওয়াটারটন ন্যাশনাল পার্কের অন্যতম আকর্ষণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির পাশাপাশি শিখা ভাবীর ফটোগ্রাফিতেও পড়াশোনা আছে। তাঁর নির্দেশনায় বেশ কিছু ছবি তোলা হলো আমাদের। তার মাত্র কয়েকটি আপনারা এই লেখায় দেখছেন।
বিকেল প্রায় চারটা। আমি সচরাচর দুপুর বারোটার কাছাকাছি খাবার খাই। কিন্তু মনোরম সব দৃশ্য উপভোগ করতে গিয়ে ক্ষুধা বলে কিছুই অনুভব করিনি।
এই পার্কের কাছাকাছি বসবাস বলে মহসিনদের এখানে মাঝেমধ্যেই আসা হয়। গত সপ্তাহেও নাকি এখানে বাঙালিদের মিলনমেলায় তারা এসেছিল। কেবল এসেছিল বললে ভুল হবে। প্রায় দুইশ মানুষের রান্নাবান্নার মূল দায়িত্বেও ছিল আমার এই বুয়েটিয়ান বন্ধু। তার মানে, সে একজন ভালো মানের রাঁধুনি ও। বন্ধুর এ বিশেষ গুন আগে জানা ছিল না।
লাঞ্চের জন্য নির্ধারিত স্পটে গেলাম গাড়িতে। শুটকির তরকারি থেকে শুরু করে শিখা ভাবী নানাপদের খাবার রান্না করে এনেছিলেন। কাঠের তৈরি সুবিশাল এই লাঞ্চ সাইটে খাবার গরম করার সুন্দর ব্যবস্থা এবং সুদৃশ্য বাথরুমও আছে। খাবার গরম করে পেটপুরে খেলাম।
৮. লাঞ্চ সারা হলে বন্ধু জানতে চাইল, কাছাকাছি অবস্থিত আরেক বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান ক্যামেরন লেইকে যেতে চাই কি না। আমরা রাজি হলাম।
গাড়িতে চড়ে ওয়াটারটন লেইক থেকে ক্যামেরন লেইকে যেতে যেতে মনে হলো, আমরা অনেক অনেক উপরে উঠে যাচ্ছি, হাজারখানেক ফুট উঁচুতে তো অবশ্যই। পথের দুই পাশে পাহাড় আর হ্রদের অসাধারণ দৃশ্যের পাশাপাশি বন্য প্রাণীর উপস্থিতিও প্রত্যাশা করছিলাম।
একসময় দেখলাম, বেশ কয়েকটি গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সবাই পাশের দিকে কী যেন দেখছে। কৌতূহলী হয়ে আমরাও গাড়ি থামালাম।
দেখি, একটি বেশ বড়সড় হরিণ রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। হরিণটি অপেক্ষা করছে তার ছোট্ট বাচ্চাগুলোর নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার জন্য। তিন তিনটি হরিণশাবককে দেখে কী মায়া লাগছিল তা ভাষায় বোঝানো সহজ নয়। আমাদের দেশে এমন দৃশ্য চোখে পড়ামাত্রই হয়তো হরিণগুলো শিকারের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যেত।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ক্যামেরন লেইকে পৌঁছে গেলাম।
ওয়াটারটন লেইকের বিশালতা উপভোগের পর ক্যামেরন লেইককে বেশ শান্ত-সৌম্য মনে হলো। পানির কাছাকাছি যেতে লেইকের ওপর কয়েক দিকে হাঁটাপথ তৈরি করা হয়েছে। সেসব পথ ধরে লেইকের কিছুটা গভীরে যাওয়া যায়।
লেইকের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হলো, পাহাড়গুলো যেন আমাদের আরও কাছে চলে এসেছে। দুপাশের গাছপালা আমাদের চারপাশে যেন এক সবুজ দেয়াল তৈরি করেছে। গাছের পাতায় পাতায় হলুদাভ রং ফুটে উঠেছে - শরতের প্রথম স্বাক্ষর হয়তো।
ওদিকে পাহাড়ের কোলে শান্ত জল। উপরে বিস্তৃত আকাশ। পানিতে আশপাশের গাছপালা আর পাহাড়ের প্রতিফলনের যে অপরূপ দৃশ্য, তা লিখে বোঝানো সহজ নয়।
হাঁটাপথ ধরে আমরা জলের কিছুটা গভীরে গিয়ে লেইকের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। ফটোগ্রাফিতে ভীষণ আগ্রহী বলে শিখা ভাবী অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে ছবি তুলতেও দ্বিধা করেন না।
এমনই এক সময় বন্ধু মহসিন ভাবীকে উদ্দেশ করে বলল, ‘হাঁটাপথের একেবারে কিনারায় যাচ্ছ কেন? পানিতে পড়ে যাবে তো!’
আহা! বন্ধুর সাবধানবাণীতে কী মধুর ভালোবাসা!
শিখা ভাবী বেশ রসিক মানুষ। তিনি হেসে বললেন, ‘চিন্তা কিসের? তোমাদের টুম্পা ভাবী আছে না?’
টুম্পা ভাবীকে আপনাদের চেনার কথা নয়। তবে সংক্ষেপে বলি, এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ তিনি। আমাদের আরেক বুয়েটিয়ান বন্ধু এহসান (ড. এহসান কিউ চৌধুরী)-এর সহধর্মিণী। ভাবীর বাবাও ছিলেন বুয়েটিয়ান। তাঁরা থাকেন টরন্টোতে।
টুম্পা ভাবী বিয়েশাদি, মানে, ম্যাচমেকিংয়ে অনেককে সহায়তা করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি এটি তাঁর শখ। আমাদের একমাত্র কন্যা অয়নের বিয়েটাও তাঁর দেখিয়ে দেওয়া ছেলে প্রতীকের সাথে হয়েছে।
এবার ক্যামেরন লেইক ছেড়ে বন্ধুর বাসায় ফেরার পালা। তার আগে ভাবী আরেকবার আমাদের চা খাইয়ে দিলেন।
৯. বন্ধুর লেথব্রিজের বাসায় ফিরতে রাত প্রায় নয়টা হয়ে গেল। বাসায় পৌঁছেই ড. সামসুল আলম, মানে, বাসু ভাইয়ের ফোন পেলাম। ভাই বললেন, ‘দেরি না করে আমার এখানে চলে আসুন। হাত-মুখ ধুয়ে বিশ্রামও আমার এখানেই করবেন।’
মিনিট দশেক গাড়ি চালিয়ে বন্ধু মহসিন আমাদের বাসু ভাইয়ের বাসায় নিয়ে গেল।
কথা ছিল চা-পানি খাওয়ার। কিন্তু বাস্তবে দেখি, গলদা চিংড়ি, ইলিশ মাছ থেকে শুরু করে কোনো কিছুই ডিনারের টেবিলে বাদ পড়েনি। আমাদের জন্য অসাধারণ সব রান্না হয়েছে। মরিয়ম ভাবীকে রান্নায় সহযোগিতা করেছে তাদের পিএইচডি করা কন্যা। কানাডায় জন্ম আর বেড়ে উঠা মেয়েটিও সারাক্ষন আমাদের সাথেই ছিল। আমাদের দেশে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা ছেলেমেয়েদের চেয়েও সে অনেক ভালো বাংলা বলে দেখে বেশ পুলকিত হলাম।
চা-পানি ঠিকই পরিবেশন করা হলো, তবে তা খাবারের পর। এ সময়ে বাসু ভাই তাঁদের বাসার ছোট্ট জিম (ব্যায়ামাগার)-এ নিয়ে ওয়েট লিফটিং, বাইক-সহ আরও বেশ কিছু ইকুইপমেন্ট দেখালেন, যা তাঁকে এ বয়সেও 'তরুণ' রাখতে সাহায্য করেছে। তাদের বাসার ভেতরে মেইন ফ্লোর থেকে ওপরের তলায় ওঠার যে বাঁকা কাঠের সিঁড়িটি, সেটি বড়ই দৃষ্টিনন্দন। মন ভরে বেশ কিছুক্ষণ সিঁড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সাজানো-গোছানো, ছিমছাম বাড়িটি দেখে মনে হলো, বাসু ভাইয়ের রুচিবোধ বেশ চমৎকার। তাছাড়া, বাড়ির পেছনেই রয়েছে একটি সুদৃশ্য লেইক। তবে রাতের আঁধারে লেইকটির সৌন্দর্য তেমন একটা উপভোগ করতে পারিনি।
বাসু ভাইয়ের বাসা ছেড়ে মহসিনদের বাসায় যখন ফিরলাম, তখন প্রায় রাত একটা। পরদিন সকাল দশটার দিকে বন্ধুর বাসা ত্যাগ করি।
দুদিনব্যাপী আদর-আপ্যায়ন করেই ক্ষান্ত হননি, শিখা ভাবী বিদায়ের সময় একটি উপহারের ব্যাগও আমার স্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন। কিছু মানুষের বন্ধুভাগ্য বেশ ভালো হয়। নিঃসন্দেহে, সেই সৌভাগ্যবানদের একজন আমি। মহসিনের মতো একজন ভালো বন্ধু ছিল বলেই আজ জামাই-আদরে টানা দুদিন লেথব্রিজ ও তার আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ পেলাম।
১০. কানাডার বড় বড় শহর - যেমন, টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, ক্যালগেরি, এডমন্টন, ভ্যাঙ্কুভার - এসবের গল্প আমরা অনেকের লেখায় নিয়মিত পড়ি। কিন্তু, আলবার্টা প্রদেশের ছোট শহরগুলোর অন্যতম লেথব্রিজের মতো শান্ত, সৌম্য ও দৃষ্টিনন্দন শহরগুলো সচরাচর কারও লেখার বিষয় হয়ে ওঠে না। তাই ভাবলাম, নিজের চোখ দিয়ে পাঠকবন্ধুদের ‘শিনুকের শহর’ লেথব্রিজকে খানিক দেখানোর চেষ্টা করি।
সত্য বলতে কি, আমাদের এ ভ্রমণ শুধু একটি শহর দেখার উদ্দেশ্যে ছিল না। পরিবারের সবচেয়ে আদরের সন্তানটিকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে যে শূন্যতা নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম লেথব্রিজ থেকে ফেরার সময় সেই শূন্যতা খানিকটা হলেও হালকা হয়ে এসেছিল। সঙ্গে নিয়ে ফিরেছি পুরোনো বন্ধুত্বের উষ্ণতা, নতুন বন্ধুতা, অমোচনীয় স্মৃতি আর প্রকৃতির অপূর্ব কিছু দৃশ্য। সবমিলিয়ে ‘শিনুকের শহর’ লেথব্রিজ কেবল একটি বেড়ানোর জায়গা হিসেবে নয়, বরং মন খারাপের দুঃসময়ে বন্ধুর বাড়িতে পাওয়া উষ্ণতার তীর্থস্থান হিসেবেও মনে থাকবে অনেক অনেক দিন।