১২ বছর পর খুলল চীন- উত্তর কোরিয়াকে সংযুক্তকারী সেতু

দীর্ঘ ১২ বছর পর চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সংযুক্তকারী একটি সেতু খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে সেতুটি চালু করা হলো। 

চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে দেশটির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চীন উত্তর কোরিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহায়তার উৎস হিসেবে রয়েছে।

ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদং থেকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। সেতুটি চালুর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান স্থলপথ হয়ে উঠতে পারে।

২০১৪ সালে সেতুটি চালু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বেইজিংয়ের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটলে উত্তর কোরিয়া তাদের অংশে অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করে দেয়। ফলে সেতুটির চালু হওয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এক ভিডিও বার্তায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেন, এই সেতুটি ‘চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বের একটি নতুন প্রতীক’। তিনি আরও বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশ তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘একটি নতুন অধ্যায়’ উন্মোচন করছে।

‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ কয়েক দশক পুরনো চীন-কোরিয়া মৈত্রী সেতুর বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। পুরনো সেতুটি ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে নির্মাণ করেছিল জাপান।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বুধবার বলেন, নতুন সেতুটি দুই দেশের মধ্যে ‘যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম’। তিনি বলেন, এই পথটি ‘বাণিজ্য এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদানকে আরও সহজ করবে’।

গত বছর দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২.৭ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগ রপ্তানিই করেছিল চীন।

তবে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর থাকায়, সীমান্ত দিয়ে হঠাৎ করেই বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের চীনা অধ্যয়ন বিষয়ক অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং।

তিনি বলেন, ‘পিয়ংইয়ং নিজেও চীনা পণ্যের হঠাৎ বড় ধরনের আমদানি নিয়ে সতর্ক; কারণ এতে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনের প্রভাব অনেক বেড়ে যেতে পারে। চীনও এই উদ্বেগের বিষয়টি ভালোভাবেই জানে, তাই বাণিজ্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’

বেইজিং ও পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিনের মিত্র। তাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে—এটিই একমাত্র দেশ যার সঙ্গে চীনের এমন কোনো চুক্তি আছে।

তবে এই মিত্রতায় যে কোনো টানাপোড়েন নেই, তা কিন্তু নয়। ২০১০-এর দশকের বড় একটি সময়জুড়ে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল বেশ শীতল; কারণ পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে বেইজিংয়ের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছিল। ২০১৭ সালে কিম জং উন একটি পারমাণবিক পরীক্ষা চালান এবং এরপর থেকে নিষিদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও বাড়িয়ে দেন। এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে তাদের সামরিক জোটকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

তবে ইদানীং চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বলেন, ‘মাত্র এক দশক আগেও বেইজিং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিকীকরণের কঠোর সমালোচনা করত, এমনকি পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের আহ্বানও জানিয়েছিল। কিন্তু এখন চীন এ বিষয়ে প্রায় কিছুই বলছে না।’ 

সূত্র: বিবিসি