গবেষণা

ইসলামী অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত: নৈতিক পুঁজিবাদ হতে পারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

ইসলামী অর্থনীতি শুধু সুদমুক্ত ব্যাংকিং, হালাল পণ্য কিংবা ইসলামি বন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধই নয়, এটি নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটি বিস্তৃত দর্শন। বাজারব্যবস্থা, ব্যক্তিমালিকানা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও মুনাফার সুযোগ অক্ষুণ্ন রেখেও অর্থনীতিকে নৈতিক মূল্যবোধের অধীনে পরিচালনা করা সম্ভব। এই ধারণাকে ‘আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ’ বা ‘স্পিরিচুয়াল ক্যাপিটালিজম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী অর্থনীতির এই ধারণা নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণের চাপ, আয়বৈষম্য, শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নৈতিকতাভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী অর্থনীতির মূল ভিত্তি নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা

ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি হলো তাওহিদ, খিলাফাহ, আমানাহ, আদল ও ইহসানের মতো মৌলিক ধারণা। এসব ধারণা অনুযায়ী, সম্পদ অর্জনের অধিকার থাকলেও তার ব্যবহার সম্পর্কে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। সম্পদকে কেবল ব্যক্তিগত ভোগের উপকরণ হিসেবে না দেখে সামাজিক কল্যাণ ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

এ ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারকে অর্থনৈতিক লেনদেনের ন্যূনতম শর্ত এবং ইহসানকে উৎকর্ষ ও কল্যাণের উচ্চতর মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র মানুষের অধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, ওয়াক্‌ফের মতো প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইসলামী অর্থনীতিতে রিবার নিষেধাজ্ঞা এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারণায় অর্থায়নকারী ও উদ্যোক্তার মধ্যে ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও সাফল্যের অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো অর্থায়নকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ন্যায্য লেনদেন উৎসাহিত করা।

পুঁজিবাদের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

ইসলামী অর্থনীতি বাজারব্যবস্থা, ব্যক্তিমালিকানা কিংবা মুনাফাকে প্রত্যাখ্যান করে না। সৎ ব্যবসা, চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, প্রতিযোগিতা এবং সম্পদ সৃষ্টিকে স্বীকৃতি দেয়। তবে মুনাফাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করার বিরোধিতা করে।

এই দর্শনের মূল বক্তব্য হলো, মুনাফা অর্জন বৈধ ও প্রয়োজনীয় হলেও তা প্রতারণা, শোষণ কিংবা সামাজিক ক্ষতির বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়। সম্পদের মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকলেও সেই সম্পদের ব্যবহার সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

এ কারণে ইসলামী অর্থনীতিকে নিছক পুঁজিবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে না দেখে বাজার, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বিত কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এর লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রেখে সম্পদ সৃষ্টিকে মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা।

ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে গবেষণাভিত্তিক অর্থনীতি

ইসলামী অর্থনীতির সমালোচকদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ তিমুর কুরান উল্লেখযোগ্য। তার মতে, ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে প্রচলিত অনেক আলোচনা বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। তার সমালোচনায় এ ধারার কিছু গবেষণায় বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে ধর্মীয় উপদেশ ও পরিচয়ভিত্তিক আলোচনার প্রাধান্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

তবে এই সমালোচনার জবাবে ইসলামী অর্থনীতিকে পরীক্ষাযোগ্য গবেষণার ভিত্তিতে বিকশিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত সততা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক আস্থা এবং দরিদ্রের প্রতি দায়িত্বশীলতার মতো বিষয়গুলোকে অর্থনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণাযোগ্য অনুমান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যেসব সমাজে ব্যবসায়িক সততা, চুক্তি পালনের প্রবণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দানব্যবস্থা শক্তিশালী, সেসব সমাজে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বেশি কি না, তা পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক গবেষণার মাধ্যমে পরীক্ষা করা সম্ভব।

এ জন্য সুস্পষ্ট গবেষণা মডেল তৈরি, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, অর্থমিতিক বিশ্লেষণ, গবেষণার ফলাফল সহকর্মী বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত করা এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের যৌথ গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কী কী সংস্কার প্রয়োজন?

বাংলাদেশে ইসলামী অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কয়েকটি ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রস্তাব উঠে এসেছে।

প্রথমত, ইসলামী ব্যাংকিংয়ে প্রকৃত ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। ব্যাংক ও উদ্যোক্তার মধ্যে ব্যবসায়িক সাফল্য ও ব্যর্থতার ঝুঁকি যথাযথভাবে বণ্টিত হলে অর্থায়ন বাস্তব উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, করজে হাসানা বা সুদমুক্ত কল্যাণমূলক ঋণব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

তৃতীয়ত, জাকাত ও ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত, স্বচ্ছ ও পেশাদারভাবে পরিচালনার জন্য কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়ানো সম্ভব।

চতুর্থত, সুকুক বাজারকে সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ ও আবাসনের মতো বাস্তব অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন পরিমাপের ক্ষেত্রে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির পাশাপাশি মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, পারিবারিক কল্যাণ, সম্পদের নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

লক্ষ্য বাজারকে প্রত্যাখ্যান নয়, মানবিক করা

ইসলামী অর্থনীতির প্রবক্তাদের মতে, এর উদ্দেশ্য আধুনিক বাজারব্যবস্থাকে বাতিল করা নয়; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও সামাজিক কল্যাণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও মানবিক করে তোলা। একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে করা অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যাচাই করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক সুযোগের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে এ ধারণা নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তবে এর বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর নীতি, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নৈতিক দায়িত্বকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে পরিপূরক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ‘আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ’ ধারণার মূল কথা।