সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে ভর্তুকি কমানো, রপ্তানি খাতের নগদ প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সে সময় প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো প্রকাশ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
বর্তমান বিএনপি সরকার চলতি ও আগামী অর্থবছরে কয়েক ধাপে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন-ভাতা দিতে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। কমিশন এ ব্যয় প্রাক্কলন করেছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন বাবদ ৩৯ হাজার ৩৪০ কোটি, বিভিন্ন ভাতায় ২৯ হাজার ২৬৩ কোটি, পেনশনভোগীদের জন্য ১৯ হাজার ৭৩৩ কোটি এবং বাজেট বরাদ্দ থেকে বেতন-ভাতা পাওয়া কর্মচারীদের জন্য ১৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল।
প্রতিরক্ষা খাতসহ সরকারি চাকরিতে প্রায় ২৩ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগী এ সুবিধার আওতায় আসবেন। পুরোনো বেতন কাঠামোয় তাদের পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
কমিশনের প্রতিবেদনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কৃষি খাতের ভর্তুকি নিয়মিত পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করা ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া, জ্বালানি তেলের দাম বাজারের সঙ্গে সমন্বয় এবং ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের সুপারিশ করেছে কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে। তাই ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে এ প্রণোদনা বন্ধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট নথি অনুযায়ী, ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে সরকারের ব্যয় ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৪১ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পরবর্তী অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা।
সরকারি ব্যয় কমাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিরিক্ত বিভাগ একীভূত বা সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করেছে কমিশন। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ধীরগতির ও প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে সাশ্রয় হওয়া অর্থ অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন ও বেতন-ভাতায় ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, সরকারি ভ্রমণ, জ্বালানি তেল, লুব্রিকেন্ট, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।