কুমিল্লা নগরে যুবদলকর্মী আবু কাউছারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দিবাগত রাতে নগরের নুরপুর এলাকায় জনতা তাকে আটক করে। পরে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা তাকে নিজেদের হেফাজতে নেন।
আটকের সময় তার গায়ে রক্তমাখা জামা ছিল। পুলিশ আসার আগে বিক্ষুব্ধ জনতা কয়েক দফা মারধর করে তাকে। পরে তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত একটার দিকে নগরের নুরপুর এলাকা থেকে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা তৌহিদুলকে উদ্ধার করেন।
এদিন দিবাগত রাত তিনটার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনার পর আত্মগোপনে ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল। নগরের নুরপুর এলাকা থেকে গতকাল রাতে তাকে আটক করা হয়েছে। কাউছারের জানাজা শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হবে।
আটকের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন উল্লেখ করে ওসি আরও বলেন, একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন তৌহিদুলকে মারধর করেন। ভিড় বেশি থাকায় তাকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের হেফাজতে নিতে বেগ পেতে হয়। তৌহিদুল এখন পুলিশের হেফাজতে আছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে আরও কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে।
রক্তের দাগ দেখে শনাক্ত করার দাবি
তৌহিদুলকে প্রথম শনাক্ত করার দাবি করেছেন কুমিল্লা মহানগর যুবদলের সদস্য ও নুরপুর এলাকার বাসিন্দা সোহাগ হোসেন। তার ভাষ্য, শুক্রবার রাত ১২টার দিকে বাসায় ফেরার পথে নুরপুর পূর্বপাড়ার কাজীবাড়ির সামনে এক ব্যক্তিকে অটোরিকশা থেকে নামতে দেখেন। ওই ব্যক্তি তাকে ডেন্টিস্ট বেলালের বাড়ির পথ জানতে চান।
সোহাগের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউছার হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির যে ছবি দেখেছিলেন, ওই ব্যক্তির পোশাকের সঙ্গে সামনে থাকা লোকটির পোশাকের মিল পান। তার জামায় রক্তের দাগও ছিল। এরপর তিনি মোবাইল ফোনে থাকা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে শনাক্ত করেন এবং পুলিশকে খবর দেওয়ার কথা জানান।
সোহাগ জানান, এ সময় তৌহিদুল কোমর থেকে একটি খঞ্জর বের করে তাকে আঘাতের চেষ্টা করেন। তিনি সরে গিয়ে ইট ছোড়েন এবং চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে তৌহিদুলকে আটক করেন।
সোহাগ উল্লেখ করেন, পরে তৌহিদুল দৌড়ে পাশের একটি বাড়ির মুরগির ঘরের ছাদে উঠে যান। ততক্ষণে সেখানে লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ডিবি পুলিশের সদস্যদেরও তিনি দেখতে পান।
ভিডিওতে মারধরের দৃশ্য
পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার আগে তৌহিদুলকে মারধরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নুরপুর এলাকার একটি পুরোনো ছোট পাকা ঘরের ছাদে টিনের চালার নিচে তৌহিদুল। ছাদে ও নিচে তাকে ঘিরে আছেন কয়েক শ মানুষ, অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা। লোহার সিঁড়ি বেয়ে কয়েকজন ছাদে উঠে তাকে টেনেহিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা করেন। এ সময় ডিবির সদস্যদেরও তাকে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেষ্টা করতে দেখা যায়।
ছাদের ওপর বিক্ষুব্ধ কয়েকজন তৌহিদুলকে লাথি ও কিলঘুষি মারেন। নিচে নামার পর তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আবার লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। অন্য একটি ভিডিওতে তাকে একটি পাকা ঘরের সামনে মেঝেতে বসে থাকতে দেখা যায়। তখন তার পা থেকে রক্ত ঝরছিল। দুটি ভিডিওতেই তাকে লুঙ্গি পরা ও খালি গায়ে দেখা গেছে।
জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যার অভিযোগ
শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লা নগরের ছত্রখিল এলাকায় গোমতী নদীর উত্তর পাড়ে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আবু কাউছারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি নগরের কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় মাসুম নামের এক অটোরিকশাচালকও আহত হন।
কাউছারের ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, তার বন্ধু শামীম হোসেন নদীর পাড়ে একটি জমি কিনেছিলেন। জমিটির দখল নিয়ে শামীমের সঙ্গে তৌহিদুল ও তার সহযোগীদের বিরোধ চলছিল। শুক্রবার সকালে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে তৌহিদুল ফোন করে কাউছারকে ডেকে নেন। পরে কাউছার, শামীমসহ কয়েকজন অটোরিকশায় করে সেখানে গেলে তাদের ওপর হামলা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, তৌহিদুল, তার ভাই তানজিলসহ কয়েকজন এ হামলায় অংশ নেন। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাউছারের ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপানো হয়। পরে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
কাউছারকে হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল বলে দাবি করেন নিহতের পরিবার। তাদের দাবি, তৌহিদুলের হাতে দা এবং অন্য হামলাকারীদের হাতে ছুরি ছিল। হামলার পর কয়েকজন দুটি মোটরসাইকেলে করে সীমান্তের দিকে পালিয়ে যান।
এদিকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কাউছারের ভাই কবির হোসেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তৌহিদুল বা তার পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কুমিল্লা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান জানান, কাউছার একসময় কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য ছিলেন। সম্প্রতি তিনি নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছিল না। তার বড় ভাই কবির হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি।