কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে যশোরের একই পরিবারের চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন এক দম্পতি ও তাদের দুই শিশুসন্তান। আগুনে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তারাও থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে স্বজনেরা। তবে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১২টা পর্যন্ত তাদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিসোর্টের ২০২ নম্বর কক্ষে তাদের বুকিং ছিল। অথচ হাসপাতাল, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পরিবারের সবার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিহত ও আহতদের তালিকায়ও তাদের নাম পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। বুকিংয়ের নথি থাকার পরও পরিবারের সদস্যদের খোঁজ না মেলায় উদ্বেগে রয়েছেন তারা।
নাহিদুর রহমান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা এবং সাত বছর বয়সী মেয়ে রোবাইনা ও তিন বছর বয়সী মেয়ে সুনাইনাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন।
জানা যায়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন নাহিদুর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহিরা সিদ্দিকা সূচি জানান, নাহিদুরের পরিবার উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। বাড়িতে তার বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন; তারাও যোগাযোগ করতে পারছেন না।
রিসোর্টের বুকিং নথি অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য নাহিদুর রহমানের নামে ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষটি দুই অতিথির জন্য বুক করা হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। বুকিংয়ের বিলের একটি কপি সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে।
নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, তার ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাবেন বলে জানিয়েছিলেন। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তিনি নাহিদুরকে ফোন করেন। কিন্তু নাহিদুর বা তার পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এরপর থেকে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা তাদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন।
এ বিষয়ে নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামান জানান, তিনি চীনে রয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর শোনার পর তিনি ও প্রতিষ্ঠানের অন্যরা নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
নাহিদুরকে ভালো কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, খবরটি শোনার পর থেকে তিনি অসহায় বোধ করছেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, নাহিদ নিখোঁজ রয়েছেন বলে পুলিশ জেনেছে।
পরে তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। সেগুলো উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে; পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন।
এদিকে গতকাল সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ছয়জন আহত হন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিহতদের তালিকায় পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।
আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীর প্রায় ৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান জানিয়েছেন, ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হচ্ছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, রিসোর্টের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।