সৌদি আরবের বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুতি বিদ্রোহীদের উপর্যুপরি হামলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করিতেছেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু হামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহতের ঘটনাও ঘটিয়াছে। তবে এই মুহূর্তে যাহারা সৌদি আরবে রহিয়াছেন, তাহাদের সংকটের চাইতে যাহারা ছুটিতে দেশে আসিয়া আটকা পড়িয়াছেন, তাহাদের সমস্যাই আজ বড় হইয়া দেখা দিয়াছে। কেননা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা-রিয়াদ ফ্ল্যাইট একের পর এক বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় এই সকল বাংলাদেশি কর্মী পড়িয়াছেন চরম বিপাকে। অগত্যা তাহারা এখন কাজে ফিরিয়া যাইতে পারিতেছেন না। বিদেশযাত্রা পিছাইয়া যাওয়ায় তাহাদের ভিসার মেয়াদ ও চাকুরি লইয়া তৈরি হইয়াছে অনিশ্চয়তা। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত এক রিপোর্টে তাহাদের নানা প্রকার ভোগান্তি ও হয়রানির কথা তুলিয়া ধরা হইয়াছে। ইহাতে কেহ কেহ বিকল্প পথে সৌদি আরব যাওয়ার চেষ্টা করিতেছেন বটে, তবু তাহাদের দুর্ভোগের সীমা নাই।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বেবিচকের এক তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ হইতে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হইয়াছে। ইহাতে এই সকল ফ্লাইটের ১৮ হাজার ৩৬২ যাত্রী ভোগান্তিতে পড়িয়াছেন। তাহার মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৫২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৬৬টি। এই দিকে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাইতে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা এড়াইতে বিকল্প হিসাবে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের পাঠানোর চেষ্টা করিতেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে বিনা খরচে অন্য ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করা হইতেছে। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বৎসরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র লইয়াছিলেন ৮ লক্ষ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এই বৎসরের একই সময়ে সংখ্যাটি কমিয়া হইয়াছে ৫ লক্ষ ৮০ হাজার ৬৩২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ হ্রাস পাইয়াছে। শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লক্ষ ৭২ হাজার ৫৪ হইতে কমিয়া হইয়াছে ৩ লক্ষ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এই কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক।
উল্লেখ্য, সৌদি আরব বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স পাঠানোর হার উভয় দিক হইতে শীর্ষস্থানীয় শ্রমবাজার। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সৌদি আরবে ৩৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত রহিয়াছেন। শুধু ২০২৫- ২৬ অর্থবৎসরে সৌদি আরবে গিয়াছেন ৬ লক্ষাধিক বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এই সময়ে দেশটি হইতে ৫৮৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসিয়াছে। আগের বছরের তুলনায় ইহা ৩৭ শতাংশ বেশি। এই দিক হইতে এই খবর কিছুটা স্বস্তিদায়ক; কিন্তু বর্তমান সংকটের অবসান না হইলে অদূর ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স আসিবার হার কমিয়া যাইতে পারে। এই জন্য বেগতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মতৎপরতা বাড়াইতে হইবে। শুধু সৌদি আরব নহে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশেই যাহাতে কর্মবাজার সংকোচিত না হয়, ইহার পাশাপাশি প্রবাসীদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে, তাহার সুব্যবস্থা করিতে হইবে।
আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তাই এই খাতের যে কোনো সংকটকে হেলাফেলা করিবার কোনো অবকাশ নাই। এই জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলির সহিত সার্বক্ষণিক কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করিয়া আটকাইয়া পড়া কর্মীদের পুনরায় কর্মস্থলে ফেরানোর জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। প্রয়োজনে ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি বিকল্প ফ্লাইটের বর্তমান বন্দোবস্ত অব্যাহত রাখিতে হইবে।