মাদকবিরোধী অভিযান শুধু মাদক ব্যবহারকারী বা আসক্ত ব্যক্তিদের আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মূল সরবরাহকারী, চোরাচালান চক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুববিষয়ক সহসম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ। তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের বিস্তার থেকে সুরক্ষা দেওয়া। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
মাদকবিরোধী অভিযান, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ।
মাদকবিরোধী অভিযানে ছোটখাটো ব্যবহারকারী বা আসক্ত ব্যক্তিদের আটক করা হলেও বড় মাদক সরবরাহকারী ও চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা দৃশ্যমান—এমন প্রশ্নের জবাবে মীর নেওয়াজ বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। মাদকের মূল সরবরাহকারী, চোরাচালান চক্র, তাদের অর্থের উৎস এবং এসব অপরাধে জড়িত পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা তার পৃষ্ঠপোষক প্রভাবশালী হলেও তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেনের ভূমিকা ও তার পদত্যাগের বিষয়ে মীর নেওয়াজ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই যথেষ্ট নয়, উদ্যোগ বাস্তবায়নের পদ্ধতিও যথাযথ হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, মাদকসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তুলে দিয়ে তাদের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থা করা যেত। এতে মাদকবিরোধী উদ্যোগের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়া ও সরকারি দায়িত্বের সীমারেখাও বজায় থাকত।
তিনি বলেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে জনপ্রতিনিধিরা জনসচেতনতা তৈরি, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। তবে অভিযান পরিচালনা ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করার দায়িত্ব আইন অনুযায়ী নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে মীর নেওয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রতিটি দলের নিজস্ব আদর্শ, কর্মসূচি ও সমর্থক রয়েছে। অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক বক্তব্য, নীতি ও কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান মূল্যায়ন করবে বিএনপি। জনস্বার্থে মতের মিল থাকলে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। আর নীতিগত মতপার্থক্য থাকলে তা গণতান্ত্রিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে।
এনসিপির রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ও তরুণদের অংশগ্রহণের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে বিএনপিরও সুস্পষ্ট কর্মসূচি রয়েছে। দেশের স্বার্থে দুই দলের চিন্তার মিল রয়েছে—এমন বিষয়গুলোতে গঠনমূলক আলোচনা ও সহযোগিতার সুযোগ আছে।
তবে এনসিপির রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মীর নেওয়াজ বলেন, কিছু অপশক্তির প্রভাব কিংবা ভুল রাজনৈতিক পরামর্শের কারণে দলটি জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাদের উচিত দেশ গঠন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা।
নিজেদের ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের সময়েও ভুলত্রুটি ছিল। তবে এনসিপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মব সৃষ্টি ও হয়রানির মতো অভিযোগ উঠতে দেখে তারা হতবাক ও হতাশ। তরুণদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল, ইতিবাচক ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি প্রত্যাশা করেন তিনি।
জামায়াত বা এনসিপি বিএনপির কোনো নীতি কিংবা সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে তা কীভাবে দেখা হবে—এমন প্রশ্নে মীর নেওয়াজ বলেন, যুক্তি, তথ্য ও গঠনমূলক বিতর্কের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হলে বিএনপি তা ইতিবাচকভাবে নেবে। প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা বা সংশোধন করা হবে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি কিংবা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা হলে শুধু সেই কারণে অবস্থান পরিবর্তন করা হবে না।
চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট বন্ধ করা এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মীর নেওয়াজ।
তিনি বলেন, আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তার মতে, শুধু বাজার তদারকি দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো সম্ভব নয়। প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে খাদ্যসহায়তা পৌঁছানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেন দ্রুত বাড়ে না—এ প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ সাধারণত পণ্যের দাম আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না; কিন্তু আগে বেড়ে যাওয়া দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায় না। তাই শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কারসাজি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আর্থিক চাপে থাকা পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মীর নেওয়াজ বলেন, সাধারণ মানুষের আয় দিয়ে মাসের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কতটা সহজ হচ্ছে, সেটিই অর্থনৈতিক পদক্ষেপের সাফল্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত। বাজার স্থিতিশীল করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পথ তৈরি হতে পারে।