ফেসবুকে ‘বুস্ট’ বাটন চাপ দিলেই রাতারাতি লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে ব্যবসা। বাংলাদেশের বাজারে এই ধারণা এখনও বেশ প্রবল।
মাসের শুরুতে পেইড অ্যাডের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সাধারণ বুস্টিং বা ছোটখাটো প্রমোশন চালিয়েই ব্যবসায়ীরা আশা করেন কাঙ্ক্ষিত সেল। কিন্তু মাস শেষে হিসাব করতে গিয়ে দেখা যায়, টাকা ঠিকই খরচ হয়েছে, অথচ সেল বা ভালো মানের কাস্টমার আসার হার অত্যন্ত হতাশাজনক।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, অ্যাড কি আসলেই কাজ করছে না, নাকি বিজ্ঞাপন চালানোর পদ্ধতিতেই কোথাও মৌলিক ভুল রয়েছে?
বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ শুধু সাধারণ বুস্টিং বা এলোমেলো অ্যাড চালানোই এখন আর ব্যবসার প্রবৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট নয়।
কোন ধরণের অডিয়েন্স অ্যাডে সাড়া দিচ্ছে, কোন ক্রিয়েটিভ মেসেজ কাজ করছে এবং দিনশেষে সেই আগ্রহ কতটা ব্যবসায়িক রিটার্ন আনছে, এই এনালাইসিসগুলো বুঝে কৌশল সাজানোর গুরুত্ব এখন সবচেয়ে বেশি।
পেইড অ্যাডে খরচ হচ্ছে, কিন্তু ফল আসছে না কেন?
পেইড অ্যাডের বড় সমস্যা হলো, খরচ কত হলো তা জানলেও তা থেকে নির্দিষ্ট রিটার্ন বা Return on Ad Spend (ROAS) কত আসছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকে না।
একটি অ্যাডে হাজার হাজার মানুষের ক্লিক পড়লেও সবাই পণ্য কিনবেন না, আবার অনেকে অ্যাড দেখেও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেন না।
যখন সব ধরনের অডিয়েন্সকে একই অ্যাড দেখানো হয়, তখন সমস্যা আরও বাড়ে। কারণ যে ব্যক্তি প্রথমবার ব্র্যান্ডটি দেখছেন এবং যিনি ইতিমধ্যে ব্র্যান্ড ও পণ্য সম্পর্কে জানেন, তাদের জার্নি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এক নয়।
ফলে অ্যাড ভুল অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছে যায় এবং ব্র্যান্ডটি হারায় প্রকৃত কাস্টমার গ্রুপ। এতে শুধু বিজ্ঞাপনের অর্থই অপচয় হয় না, বরং মূল্যবান সময়, সম্ভাব্য সেল এবং সঠিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও হাতছাড়া হয়।
ডেটাভিত্তিক কৌশলই হতে পারে সমাধানের পথ!
ডেটাভিত্তিক মার্কেটিং মানে কেবল অনুমানের ওপর ভর করে বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাওয়া নয়। এর মূল কাজ হলো আগের ক্যাম্পেইনের ফলাফল, ওয়েবসাইটের ভিজিটরদের গতিবিধি এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের আচরণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া।
কোন ধরনের অ্যাডে মানুষ সবচেয়ে বেশি সাড়া দিচ্ছে, কারা আপনার ওয়েবসাইট ঘুরে দেখছে, কারা সরাসরি যোগাযোগ করছে এবং শেষ পর্যন্ত কারা আপনার প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত হচ্ছে, এই প্রতিটি তথ্য একজন ব্যবসায়ীকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
তবে মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের কাজের ধরন ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা।
গুগল অ্যাডস ঠিক সেই মুহূর্তে কাজ করে, যখন কোনো ক্রেতা নিজে থেকে গুগলে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবা খুঁজে। গুগল অ্যাডস গ্রাহকের তাৎক্ষণিক চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক সময়ে অ্যাডস তাদের কাছে পৌঁছায়।
অন্যদিকে মেটা অ্যাডস নতুন সম্ভাব্য ক্রেতাদের খুঁজে বের করতে এবং ইতিপূর্বে আপনার ব্র্যান্ড বা পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে এমন মানুষদের পুনরায় টার্গেট করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
ইউটিউব অ্যাডস আকর্ষণীয় ভিডিও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আপনার পণ্য বা সেবা কেন সেরা, তা গ্রাহককে বিস্তারিতভাবে বোঝাতে সাহায্য করে।
লিংকডইন অ্যাডস সাধারণ মানুষের পরিবর্তে করপোরেট পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা বিটুবি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
এছাড়া টিকটক অ্যাডস স্বল্পদৈর্ঘ্যের ও ট্রেন্ডি ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে খুব দ্রুত নতুন প্রজন্মের অডিয়েন্সের নজর কাড়ার সুযোগ তৈরি করে।
তাই বিজ্ঞাপনের সফলতা নির্ভর করে শুধু কোথায় অ্যাড দেওয়া হচ্ছে তার ওপর নয়, বরং কোন ধরনের অডিয়েন্সের কাছে, ঠিক কোন সময়ে এবং কী উপায়ে মেসেজটি পৌঁছানো হচ্ছে—তার সঠিক সমন্বয়ের ওপর।
যেভাবে এই সমস্যার সমাধান করছে ভাইজার এক্স
একটি স্বনামধন্য ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানি হিসেবে ভাইজার এক্স-এর কৌশল কেবল গতানুগতিকভাবে অ্যাড চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর কার্যপদ্ধতি শুরু হয় ডিপ এনালাইসিসের মাধ্যমে, যেখানে বাজারের বর্তমান অবস্থা, সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রি বা খাতের প্রতিযোগিতা, পূর্বে চালানো ক্যাম্পেইনের ফলাফল এবং সম্ভাব্য গ্রাহকদের আচরণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঠিক করা হয় কোন মেসেজটি কোন মাধ্যমে বা কার কাছে পৌঁছানো উচিত।
এর বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় একটি সুপ্রতিষ্ঠিত হোম লোন ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত বিজ্ঞাপন চালিয়ে আসছিল এবং তাদের সেবার মান ও গ্রাহকদের অভিজ্ঞতাও ভালো ছিল।
কিন্তু এরপরও বিজ্ঞাপনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল বা সেল মিলছিল না, কারণ তাদের কাছে গ্রাহকদের সঠিক ডেটা বা বাজেট অপচয়ের সুনির্দিষ্ট জায়গাগুলোর কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না।
ভাইজার এক্স (VISER X) দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কাজটি ছিল অ্যাকাউন্টে থাকা বিগত ডেটা ও এনালিটিক্সগুলো বের করে আনা এবং সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বায়ারদের আচরণ বিশ্লেষণ করা।
এরপর প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব অডিয়েন্সের আগ্রহ ও সঠিক টার্গেটিংয়ের পরিধি নির্ধারণ করে সম্পূর্ণ ডেটা-নির্ভর একটি ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
এই কৌশলের ফলে ক্যাম্পেইন থেকে ৬৫৪টি কোয়ালিফাইড লিড এবং ৭.৯৪ শতাংশ ক্লিক-থ্রু রেট (সিটিআর) অর্জিত হয়। পাশাপাশি, প্রায় ১০ গুণ রিটার্ন অন অ্যাড স্পেন্ড (আরওএএস) এর মাধ্যমে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ ডলারের বেশি সম্ভাব্য আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
গত পাঁচ বছরে এই সুনির্দিষ্ট কৌশলের মাধ্যমেই বিভিন্ন ক্লায়েন্টের ব্যবসা থেকে ১৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি রেভিনিউ এনে দিয়েছে ভাইজার এক্স। বর্তমানে তাদের ৫০ জনের একটি অভিজ্ঞ দল দেশ ও বিদেশের ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের দায়িত্ব সফলভাবে সামলাচ্ছে।
এর মূল লক্ষ্য হলো বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, যা মূলত সাধারণ বুস্টিং এবং কৌশলগত অ্যাডের মধ্যে তৈরী করে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
এ আই (Artificial Intelligence) এর সঙ্গে কৌশলের বিবর্তন
এর মধ্যেই এ আই-এর উত্থানে মানুষের সার্চ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায়ও এসেছে আরও পরিবর্তন। ভাইজার এক্স এই পরিবর্তনকে দ্রুত গ্রহণ করে এবং এ আই-ড্রিভেন সার্চে ব্যবসার ভিজিবিলিটি বাড়ানোর জন্য প্রচলিত কৌশলের সঙ্গে নতুন পদ্ধতিগুলোকে যুক্ত করে।
এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভাইজার এক্স-এর সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা জনাব ফয়সাল মোস্তফা-এর ভাবনা এবং উদ্যোগের।
তাঁর নেতৃত্বে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুত রাখা এবং এটিকে ব্যবসায়িক সমস্যার বাস্তব সমাধানে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই ধারাবাহিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশলই ভাইজার এক্স-এর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে, যেখানে লক্ষ্য শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করাই নয়, বরং সেটিকে ক্লায়েন্টের ব্যবসায়িক ফলাফলে কাজে লাগানো।
ভবিষ্যতের ডিজিটাল মার্কেটিং হবে আরও ডেটানির্ভর
বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যবহার যতো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাজারের প্রতিযোগিতা ততোটাই বেড়ে উঠছে।
ভবিষ্যতে শুধুমাত্র বেশি অর্থ খরচ করে অডিয়েন্স তৈরি করা বা এলোমেলোভাবে প্রচার চালানো কোনোটিই টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হবে না।
কোন ধরনের ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে হবে, কোন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলবে এবং আগের ক্যাম্পেইনগুলোর সূক্ষ্ম ইনসাইট কী বলছে, এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে ব্যবসার মূল চাবিকাঠি।
আগামী দিনে যে ব্যবসাগুলো বাজারে সফলভাবে টিকে থাকতে চাইবে, তারা কেবল গতানুগতিকভাবে পেইড অ্যাড চালিয়েই থেমে যাবে না; বরং প্রতিটি বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া ডেটা যত্নসহকারে সংগ্রহ করবে এবং সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে কাজে লাগাবে।
অর্থাৎ ডিজিটাল মার্কেটিং ধীরে ধীরে অনুমানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শতভাগ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে যারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে, কেবল তারাই প্রতিযোগিতার মাঝে নিজেদের ব্যবসা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।