নাটোরের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। একইসঙ্গে এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। বনপাড়া হাইওয়ে থানার সহকারী পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার সময় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে এই ঘটনা ঘটে। এ সময় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, বরিশালের বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী আরপি পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে পাবনাগামী বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও উদ্ধারকারীরা ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক তামিম।
তিনি বলেন, ‘বাসে শতাধিক যাত্রী ছিল। জায়গা না পেয়ে বাসের গেটে বসেছিলাম। দুর্ঘটনার পর বালির মধ্যে পড়েছিলাম। আমার ওপর আরও তিনজন ছিল। আল্লাহ বাঁচাইছে। কী যে ভয়ংকর অবস্থা ছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো না। লোহার সাথে পা আটকে ছিল। ওঠার মতো অবস্থা ছিল না।’
মাদারীপুর থেকে বাসে উঠেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, মাদারীপুর থেকে বাসে উঠেছিলাম। আমার সঙ্গে শুধু মাদারীপুর থেকেই উঠেছিলেন অন্তত ৫০ জন।
তার দাবি, সব সিটে যাত্রী বসা ছিল। গেট থেকে পেছন পর্যন্ত ঠাসাঠাসি করে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়েছিল।
আহত যাত্রীরা জানায়, বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের বাসটিতে শতাধিক যাত্রী ছিলেন। তাদের অভিযোগ, চালকের পরিবর্তে বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার।
ওই বাসের যাত্রী ঝিনাইদহ জনতা ব্যাংকে কর্মরত কালীগঞ্জের জুয়েল কিবরিয়া জানান, দুর্ঘটনার পর বাসের হেলপারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। হেলপার তাকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় চালকের বদলে গাড়ি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার।
জানা যায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন- নওগাঁর আব্দুর নূর ও চিরঞ্জিত, রাজশাহীর শহিদুল ইসলাম, সিয়াম, মজনু ও ফজলু হক ঝিনাইদহের ডা. এস এম মুশফিকুর রহমান, তাওহীদ ও জুয়েল কিবরিয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের তামিম, ববি, শামীম ও ডালিম মাদারীপুরের ইমা ও নার্গিস নাটোরের নেহাল ও জুলফিকার।
এদিকে নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), একই উপজেলার বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), জাজিরা উপজেলার সামাদ (৭০), কাশেম (৩৫) ও জহুর উদ্দিন। এছাড়া বাসটির চালক রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০) নিহত হয়েছেন।
বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন জানান, আরপি পরিবহনের বাসটি বরগুনা থেকে যাত্রী নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। অন্যদিকে, পঞ্চগড় থেকে বালু নিয়ে একটি ট্রাক যাচ্ছিল ঝিনাইদহের দিকে। ভোরে সরকারপাড়া এলাকায় পৌঁছালে যানবাহন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
এসআই শামীম হোসেন বলেন, ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন দিয়ে চলছিল। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, দ্রুতগতিতে চলা বাসটি অন্য একটি যানবাহনকে ওভারটেক করার সময় ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।