কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়ক। ব্যস্ত এই সড়কের দুপাশ জুড়ে সারি সারি গাছ। আঁকাবাকা পথ ধরে প্রতিদিন চলাচল করে অসংখ্য মানুষ ও যানবাহন । তবে ইদানীং এ পথে চলতে গিয়ে পথচারীদের চোখ আটকে যাচ্ছে গাছের গায়ে টাঙানো ছোট ছোট প্ল্যাকার্ডে। কোথাও লেখা ‘অকারণে গাছ কাটব না’, ‘পাখি আমাদের বন্ধু’ 'পাখিদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ি'। আবার কোথাও ‘মোড়ে গতি কমান, জীবন বাঁচান', 'অযথা হর্ন বাজাবেন না”, ‘পানিতে ময়লা ফেলবেন না' ।
শুধু পরিবেশ নয়, মাদক ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়েও রয়েছে নানা বার্তা। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এসব প্ল্যাকার্ড কোনো বড় সংগঠন বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নয় । মাত্র ১০ বছরের এক শিশুর নিজের চিন্তা, শ্রম ও সৃজনশীলতায় তৈরি হয়েছে এগুলো। শিশুটির নাম মেসবাহুল ইসলাম মুগ্ধ ।
ফুলবাড়ী উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের স্কুলশিক্ষক সুজাউদ্দৌলা ও গৃহিণী মা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে মুগ্ধ উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী । বাড়িতে পড়ে থাকা পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়েই মুগ্ধ তৈরি করে প্ল্যাকার্ড। নিজের হাতে তাতে লেখে পরিবেশ, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী ও নৈতিকতার নানা বার্তা। পরে বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে সুতা দিয়ে টাঙিয়ে দেয় সেগুলো ।
মুগ্ধের সহপাঠীরা জানায়, মুগ্ধ বাড়িতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বিকালে তাদের ডেকে নেয় । কেউ মই, কেউ সুতা নিয়ে তার বাড়িতে যায় । এরপর সবাই মিলে গাছে গাছে প্ল্যাকার্ড টাঙিয়ে দেয়। পথচারীরা সেগুলো দেখে প্রশংসা করায় তারাও আনন্দ পায় ।
পথচারী ওবায়দুল হক বলেন, ‘আমি এ পথে নিয়মিত যাতায়াত করি। হঠাৎ দেখি রাস্তার মোড় ও গাছের পাশে সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড। পরে জানতে পারি, মাত্র ১০ বছরের একটি শিশু এগুলো তৈরি করেছে। বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো। তার উদ্দেশ্যও অত্যন্ত মহৎ।'
মুগ্ধ জানায়, তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্ল্যাকার্ড তৈরি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে শিখিয়েছেন। শিক্ষকের সেই শিক্ষা থেকেই তার এ উদ্যোগের শুরু। তার ভাষায়, “আমার এলাকায় অনেকেই মাদক সেবন করে। আবার অনেক মানুষ পরিবেশের বিষয়েও সচেতন নয়। আমার লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে যদি একজন মানুষও মাদক ছেড়ে দেয়, একজন মানুষও যদি পরিবেশের কথা ভাবে, তাহলেই আমি নিজেকে সার্থক মনে করব। ভবিষ্যতেও আমি এ ধরনের কাজ করে যেতে চাই।'
মুগ্ধের বাবা শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজাউদ্দৌলা বলেন, 'আমার ছেলে এমন কাজ করছে, তা আগে জানতাম না । একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি গাছে গাছে প্ল্যাকার্ড টাঙানো। পরে জানতে পারি, এগুলো আমার ছেলেই করেছে। তার এমন কাজ দেখে আমি অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি । এ কাজে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছি।'
উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী বলেন, 'তার এ উদ্যোগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।' পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ মিয়া বলেন, শিশুদের এমন সৃজনশীল ও জনকল্যাণমূলক কাজে পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুপ্রেরণা প্রয়োজন। মুগ্ধের মতো আমাদের আগামী প্রজন্ম জ্ঞান, মেধা ও মানবিক চেতনা দিয়ে সমাজ তথা দেশকে বদলে দেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।'