যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাকের ভেতরে আটকে ৫৩ অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় মানবপাচার চক্রে জড়িত থাকার দায়ে গুয়াতেমালার এক নাগরিককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সান আন্তোনিওর একটি ফেডারেল আদালত ৩৯ বছর বয়সী রিগোবার্তো রামন মিরান্ডা-ওরোজকোকে এ সাজা দেন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুন টেক্সাসের সান আন্তোনিও শহরের উপকণ্ঠে পরিত্যক্ত একটি ট্রাকের ভেতর থেকে কয়েক ডজন অভিবাসীকে উদ্ধার করেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা। ট্রাকটিতে থাকা অভিবাসীরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে আটকে ছিলেন।
গুয়াতেমালা থেকে যাত্রা শুরু করে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন ওই অভিবাসীরা। মোট ৬৪ জন অভিবাসী ট্রাকটিতে ছিলেন। টেক্সাসের লারেডো থেকে সান আন্তোনিও যাওয়ার পথে ট্রাকটির শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন কৌঁসুলিরা। দুই শহরের দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। ট্রাকটি উদ্ধারের সময় বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল।
এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৪৮ জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে তাপজনিত অসুস্থতা ও পানিশূন্যতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ছয় শিশু ও একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ছিলেন। তাদের মধ্যে ২১ জন গুয়াতেমালার নাগরিক।
মিরান্ডা-ওরোজকো নিহত দুই অভিবাসীর যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া গুরুতর আহত এক জীবিত অভিবাসীর ক্ষেত্রেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। গত জুলাইয়ে তিনি মানবপাচারের মাধ্যমে অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করানোর ষড়যন্ত্র এবং মৃত্যুসহ গুরুতর শারীরিক ক্ষতির কারণ হওয়া অবৈধ প্রবেশে সহায়তার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।
২০২৪ সালের আগস্টে গুয়াতেমালায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের মার্চে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও গুয়াতেমালায় প্রায় ২০ জনের বিরুদ্ধে সাজা হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। মানবপাচার চক্রটির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নেতা হিসেবে চিহ্নিত ফেলিপে ওরদুনা-তোরেসকে ২০২৫ সালের জুনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত আরমান্দো গনসালেস-ওর্তেগাকে ৮৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম এখনো চলমান।
কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাকের ভেতরে আটকে পড়া অভিবাসীরা প্রাণে বাঁচার জন্য মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাকের ভেতরের দেয়ালে আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া যায়। কয়েকজনের পোশাক খুলে ফেলার আলামতও পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য অভিবাসীদের প্রত্যেককে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কৌঁসুলিরা।
মঙ্গলবার সাজা ঘোষণার পর এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জাস্টিন সিমন্স বলেন, জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টায় ভুক্তভোগীরা যে ভয়াবহ কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত থেকে সান আন্তোনিও হয়ে যাওয়া ইন্টারস্টেট-৩৫ মহাসড়কটি অভিবাসী পাচারের একটি পরিচিত রুট। সড়কটিতে বিপুলসংখ্যক ট্রাক চলাচল করায় পাচারকারীরা প্রায়ই এটি ব্যবহার করে থাকেন বলে সে সময় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জ্যাক স্ট্যাটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে মানবপাচার বন্ধের যুক্তি তুলে ধরেছে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসীরা আরও বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে পারেন।