রাজশাহীর পদ্মার চরে ঐতিহ্য আঁকড়ে বেঁচে আছেন ঘোড়ার গাড়িচালকেরা

একসময় গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে যাত্রী পরিবহন ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার অন্যতম প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দৃশ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই বাহনের ইতিহাস। কিন্তু আধুনিক যান্ত্রিক পরিবহনের প্রসারে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঘোড়ার গাড়ির ঐতিহ্য। একসময় যে বাহনকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বহু মানুষের জীবন-জীবিকা, সেটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যের কিছুটা অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় রাজশাহী শহরেও ঘোড়ার গাড়ির ব্যাপক প্রচলন ছিল। তবে বর্তমানে শহরাঞ্চলে এ বাহন খুব একটা চোখে পড়ে না। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চল থেকে হাটবাজারে কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি। পেঁয়াজ, রসুন, আলু, বেগুন, বাদামসহ বিভিন্ন ফসল বোঝাই করে মেঠোপথ পেরিয়ে বাজারে ছুটত এসব গাড়ি। এই বাহনকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেক মানুষ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে উন্নত হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা, বেড়েছে ভ্যান, ট্রাক, পিকআপ ও টলারচালিত নৌকার চলাচল। ফলে একসময়ের পরিচিত ঘোড়ার গাড়ি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে আগের মতো ঘোড়ার গাড়ির ব্যস্ততা আর চোখে পড়ে না। হাতে গোনা কয়েকজন চালক এখনো ঐতিহ্যবাহী এ পেশা ধরে রেখেছেন। তাঁদের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখারও একটি অবলম্বন। স্থানীয়ভাবে ঘোড়ার গাড়িচালকদের বলা হয় ‘কচুয়ান’।

চরাঞ্চলের ঘোড়ার গাড়িচালক আঞ্জুম হোসেন, আশরাফুল ও আব্দুস সালাম জানান, একসময় চরাঞ্চলে যাতায়াতের উপযোগী সড়ক ছিল সীমিত। নদীপথেও টলারচালিত নৌকার চলাচল ছিল না। ফলে চরাঞ্চলে উৎপাদিত ফসল বিভিন্ন হাটবাজারে পৌঁছে দিতে কৃষকদের ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হতো। এই বাহন চালিয়েই চলত তাঁদের সংসার। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আধুনিক পরিবহনের প্রসারে বদলে গেছে সেই চিত্র।

বর্তমানে চরাঞ্চল থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য রয়েছে নানা বিকল্প বাহন। দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বেশি পরিমাণ মালামাল বহনের সুবিধা থাকায় ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা যন্ত্রচালিত যানবাহনের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা কমে গেছে। চালকদের ভাষ্য, প্রায় অর্ধশত মানুষ পুরোনো এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। তবে মানিকের চর এলাকায় এখনো বাঘা থেকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা এলাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে ভাড়ায় চলে প্রায় ১০ থেকে ১২টি ঘোড়ার গাড়ি।

চরাঞ্চলের আশিতিপর বৃদ্ধ ও সাবেক গ্রাম পুলিশ নুরমোহাম্মদ জানান, আগের মতো ঘোড়ার গাড়ি না থাকলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। আদি পেশার প্রতি টান থেকে এখনো ১০ থেকে ১২ জন এ বাহন চালিয়ে যাচ্ছেন।

একসময় ঘোড়ার গাড়ির চলাচল শুধু রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পাশের নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার গোপালপুর ও বিলমাড়িয়া এলাকাতেও নিয়মিত চলত এই বাহন। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের যমুনার চরাঞ্চল, পুরান ঢাকা, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও যশোরের বিভিন্ন এলাকাতেও ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিল। গ্রামীণ জনপদে কৃষিপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি মানুষের যাতায়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এই বাহন। সময়ের পরিবর্তনে শহরাঞ্চল থেকে এটি প্রায় হারিয়ে গেলেও কোথাও কোথাও এখনো টিকে আছে এর ক্ষীণ অস্তিত্ব।

ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস। একটি ঘোড়া, কাঠের তৈরি গাড়ি আর চালকের শ্রম—এই সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল চরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার বিস্তারে সেই দৃশ্য বদলে গেলেও অতীতে কত মানুষের জীবিকার অবলম্বন ছিল এই বাহন, তা ভুলে যাওয়ার নয়।

প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের জীবন সহজ করেছে এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে এনেছে গতি। তবে উন্নয়নের ধারায় হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাও জরুরি। পুরোনো ছবি সংগ্রহ, ঘোড়ার গাড়িচালকদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা এবং স্থানীয় ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই বাহনের ইতিহাস তুলে ধরা যেতে পারে।

রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে আমের জন্য পরিচিত। এ অঞ্চলে এখনো টিকে আছে পুঠিয়া রাজবাড়ি, সুলতানি আমলে প্রতিষ্ঠিত বাঘার শাহী মসজিদসহ বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা। কিন্তু পদ্মার চর থেকে হাটবাজারে ফসল বহন করা ঘোড়ার গাড়ি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে জনজীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে। হয়তো একদিন চরাঞ্চলের মেঠোপথে আর চলবে না এই ঐতিহ্যবাহী বাহন। তখন পুরোনো ছবি আর কচুয়ানদের স্মৃতিই হয়ে থাকবে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যের সাক্ষী।