ইউপি সদস্যের পকেটে প্রতিবন্ধী ভাতার ১২ সিম কার্ড, টাকা তুলতে এসে ধরা

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে ১২টি সিম কার্ডসহ স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে আটক করেছেন এলাকাবাসী। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় ওই ইউপি সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া সিম কার্ডগুলোর মধ্যে ১০টি জব্দ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের মাড়িয়া মোড়ে একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে এ ঘটনা ঘটে।

আটক ইউপি সদস্যের নাম শহিদুল ইসলাম। তিনি গোবিন্দপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। একই সঙ্গে তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সাংগঠনিক সম্পাদক। অভিযোগ উঠেছে, নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের নাম প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তিনি এ সুবিধার টাকা নিচ্ছিলেন। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তদন্তেও এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার সকালে মাড়িয়া মোড়ের বিকাশ এজেন্ট এনামুল হকের দোকানে ভাতার টাকা তুলতে যান শহিদুল। এ সময় তিনি বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ১০টি সিম কার্ড এজেন্টের কাছে দেন। আরও দুটি সিম তার নিজের মুঠোফোনে লাগানো ছিল। একসঙ্গে এতগুলো সিম কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার চেষ্টা দেখে সেখানে উপস্থিত লোকজনের সন্দেহ হয়। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে শহিদুলের সঙ্গে তাদের বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে দোকানের বাইরে নিয়ে আসা হয়। পরে তার পক্ষের লোকজন সেখানে উপস্থিত হলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম

খবর পেয়ে হাট গাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। তদন্তকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মাকসুদ রুপক জানান, বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শহিদুলকে উদ্ধার করে। তার কাছে থাকা ১২টি সিম কার্ডের মধ্যে ১০টি জব্দ করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

শহিদুল ইসলামের দাবি, তার নিজের পাশাপাশি বাবা, ভাই ও ভাতিজির নামও প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় রয়েছে। চেয়ারম্যানের উদ্যোগেই তাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার আরও দাবি, বুধবার চেয়ারম্যানের লোকজন তাকে মারধর করে ভাতার ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে গেছেন। কেন এমন করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

তবে গোবিন্দপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, আগের সরকারের আমল থেকেই শহিদুল ১২ জনের নাম প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন। সিম কার্ডগুলোও তার নিজের ও স্বজনদের নামে নিবন্ধিত। কয়েক দিন আগে ভাতার টাকা জমা হওয়ার পর বুধবার তা তুলতে গিয়ে তিনি এলাকাবাসীর হাতে আটক হন।

প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকা তৈরিতে নিজের ভূমিকা থাকার অভিযোগ নাকচ করে চেয়ারম্যান বলেন, বরাদ্দ পাওয়ার পর তা ইউপি সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এরপর সদস্যরা যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করেন। টাকা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনার বিষয়ে আমি জানি না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শে সিম কার্ডগুলো নিজের কাছে রেখেছেন।

বাগমারা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মতিনুর রহমান বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারেন, শহিদুল নিজের ও স্বজনদের নামে প্রতিবন্ধী ভাতা নিচ্ছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে সিম কার্ডগুলোতে ইতিমধ্যে ভাতার টাকা জমা হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে ওই ইউপি সদস্য আর ভাতা পাবেন না। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে বলেও জানান তিনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। তিন মাসের টাকা একসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাতাভোগীর বিকাশ হিসাবে জমা হয়। বিকাশ এজেন্ট এনামুল হক জানান, শহিদুল ১০টি সিম কার্ড দিয়ে ভাতার টাকা তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সেখানে ঝামেলা শুরু হওয়ায় টাকা তুলতে পারেননি।