ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার।
দেশটির পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যকরণ, তরুণ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের বিকাশের দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার উত্তরায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কার্যালয়ে পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনবিষয়ক (ইএসজি) ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডেনিশ রাষ্ট্রদূত বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপরিহার্য। যেসব দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কম এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়ই দ্বিধায় ভোগেন।
তিনি স্পষ্ট করেন, তার উদ্বেগ কোনো নির্দিষ্ট সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে নয়; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার শক্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে।
মোলার বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের সামনে যে সাংবিধানিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগানো উচিত। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ বাংলাদেশকেই নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় সময় লাগবে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সফলভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে এবং এ প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, জ্বালানি সংকটসহ তাৎক্ষণিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই সনদের বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের ভুলে গেলে চলবে না। অতীতেও বাংলাদেশ বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটও দেশটি কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বাণিজ্যসুবিধা নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য ও বাজারের বহুমুখীকরণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দেন ডেনিশ রাষ্ট্রদূত।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বাংলাদেশের অর্থনীতি-সংক্রান্ত মূল্যায়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতির ঝুঁকি কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প প্রসঙ্গে মোলার বলেন, বিজিএমইএর ইএসজি ড্যাশবোর্ড আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করতে সহায়তা করবে। টেকসই উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলে ধরার মাধ্যমে এ উদ্যোগ দেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ আর শুধু কম উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা, সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড পূরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী মজুরি ব্যবস্থা শ্রম খরচ নিয়ে সরবরাহকারীদের মধ্যকার প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে ক্রেতাদের শোষণ প্রতিরোধ করতে পারে, পাশাপাশি এটি অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধি করবে এবং রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরতা কমাবে। তিনি তরুণ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাজনৈতিক দিকটি তুলে ধরে মোলার বাংলাদেশকে বর্তমান সাংবিধানিক মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের জন্য প্রয়োজন হবে সমঝোতা, বিভেদ দূরীকরণ এবং একটি স্থিতিশীল ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত সংসদীয় গণতন্ত্র।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার সফলভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব অনুভব করবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন যে, স্বল্প অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা—উভয়ই বিদ্যমান এমন একটি দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে আরও বেশি অনিচ্ছুক হতে পারেন।
রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ইএসজি ড্যাশবোর্ডটি পাঁচটি অগ্রাধিকারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অংশীদারিত্বকে সমর্থন করতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ আর শুধু কম উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা, সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড পূরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।