জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার অভিযোগে মামলা, তদন্তে এলো সড়ক দুর্ঘটনা

জুলাই আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মারধরে আহত হওয়ার অভিযোগ এনে দায়ের করা একটি মামলার নেপথ্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্দোলন নয়, মূলত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত গিয়েছিলেন বাদী জাফর আহমেদ। পারিবারিক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ অর্জনে ব্যর্থ হয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী ও এলাকার বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

২০২৫ সালের ১৫ মার্চ আদালতে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫০-২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলাটি করা হয়। মামলার আসামিদের অধিকাংশের বাড়িই মাদারীপুরের শিবচর এলাকায়।

মামলার বাদী জাফর আহমেদ অভিযোগে জানান, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় তিনি পুলিশের গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যান। এরপর তার ওপর আবার হামলা করা হয়, যার ফলে তিনি জ্ঞান হারান এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ আগস্টের পর তার পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়।

বাদী দাবি করেন, আসামিরা সবাই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং তাদের কয়েকজন ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।

মামলার দেড় বছর পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আকরামুজ্জামান জানান, তদন্তে উঠে এসেছে যে এটি কোনো জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা ছিল না।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন জাফর আহমেদ। ঘটনার পর তিনি এক পরিচিতজনকে ফোন করে মোটরসাইকেল বাসায় পৌঁছে দিতে বলেন। হাসপাতালে ভর্তির চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র এবং জুলাই আন্দোলনের গেজেট পর্যালোচনা করে তার আহত হওয়ার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাদীর বাবা ১৯৭০ সালে মাদারীপুরের শিবচরে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বাবার মৃত্যুর পর মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বাদীর সঙ্গে তাঁর মা, বড় ভাই ও শিক্ষকদের বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে স্বজন ও স্থানীয়রা তাঁকে সরিয়ে দিলে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর তীব্র মনোমালিন্য তৈরি হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এবং একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই এই মিথ্যা বিবরণ দিয়ে মামলাটি করা হয়। এজাহারে উল্লিখিত তারিখে আসামিরা কেউই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।

মামলার ৪ নম্বর আসামি ও ওই মাদ্রাসার শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জানান, বাদীর বাবার প্রতিষ্ঠানেই তারা শিক্ষকতা করছেন। বাদী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর হুইলচেয়ারে করে মাদ্রাসায় এলে তারাই তাকে ধরে দোতলায় ওঠান। ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে তাদের ওপর মিছামিছি হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় পুলিশ তাদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আগামী ২ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।