রুপালি পর্দার চোখ ধাধানো আলো আর গ্ল্যামারের অন্তরালে বলিউড পাড়ায় এখন এক আদিম অন্ধকার ও ভয়ের রাজত্ব। আন্ডারওয়ার্ডের সেই চেনা আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে বলিপাড়ায়, তবে কোনো গোপন আস্তানা থেকে নয়, এবার ত্রাসের উৎস গুজরাটের সাবরমতি কেন্দ্রীয় কারাগারের চার দেয়াল। সেখান থেকেই আক্ষরিক অর্থেই পুরো বলিউতকে জিম্মি করে রেখেছে কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই। একের পর এক রক্তক্ষয়ী হামলা, প্রাণনাশের হুমকি আর কোটি কোটি রুপির চাঁদাবাজির মুখে পড়ে বলিপাড়ার প্রথম সারির তারকারা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জীবন বাঁচাতে বুলেটপ্রুফ গাড়ি, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্লাস শিল্ড আর সশস্ত্র কমান্ডো বাহিনী এখন তারকাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বলিউড যেন রাতারাতি রূপান্তরিত হয়েছে এক 'বুলেটপ্রুফ' দুর্গে।
সালমানকে না পেয়ে 'সহজ লক্ষ্য' টাইগার
গত ১৮ অক্টোবর (রবিবার) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহুর পুশপা পার্ক এলাকায় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে ফিল্মি স্টাইলে ৩ থেকে ৪ রাউন্ড গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলায় টাইগার শ্রফ অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তার গাড়িচালক জরুতর আহত হন। হামলার পরপরই গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অন্যতম প্রধান সহযোগী অনিল পণ্ডিত ও হারমান সান্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা দিয়ে এর দায় স্বীকার করে।
মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং দিল্লির বিশেষ সেলের তদন্তে উঠে এসেছে এক রুদ্ধশ্বাস ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। হামলাকারীদের মূল টার্গেট আসলে টাইগার শ্রফ ছিলেন না, তাদের আসল লক্ষ্য ছিলেন স্বয়ং সালমান খান। শুটাররা সালমানের বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে রেকি (নজরদারি) করেছিল। বিন্তু সেখানে মুম্বাই পুলিশের কড়া নিরাপত্তা এবং সালমানের 'ওয়াহ-প্লাস' সুরক্ষাবলয় দেখে তারা পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর তারা ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ট্র্যাক করে টাইগারের রবিবারের ফুটবল খেলার শিডিউল জানতে পারে। তুলনামূলক কম নিরাপত্তা থাকায় এক প্রকার 'সহজ লক্ষ্য' হিসেবে টাইগারের ওপর চড়াও হয় শুটাররা। অনিল পণ্ডিত সরাসরি অডিও বার্তায় হুমকি দিয়ে বলেছে, 'যারা সালমান খানকে সমর্থন করবে বা তার সাথে কাজ করবে, তাদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। এক এক করে সবার নম্বর আসবে।'
কৃষ্ণসার হরিণ শিকার ও সালমান খানের সাথে পুরোনো বৈরিতা
বলিউডের ওপর লরেন্স বিষ্ণোইয়ের এই আক্রোশের মূল সূত্রপাত ১৯৯৮ সালে রাজস্থানে 'হাম সাথ সাথ হ্যায়' সিনেমার শুটিংয়ের সময় সালমান খানের বিরুদ্ধে ওঠা কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। রাজস্থানের প্রকৃতিপ্রেমী 'বিষ্ণোই' সম্প্রদায়ের মানুষেরা কৃষ্ণসার হরিণকে অত্যন্ত পবিত্র এবং ধর্মীয় আবেগের প্রতীক মনে করে। লরেন্স বিষ্ণোই সেই সময় থেকেই সালমানের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয়। ইতিপূর্বে ২০২৪ সালের এপ্রিলেও সালমানের বাসভবনের বাইরে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছিল এই গ্যাং। বিষ্ণোইয়ের দাবি স্পষ্ট সালমান খানকে তাদের মন্দিরে গিয়ে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, না হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।
হিটলিস্টে রণবীর কাপুর ও রণবীর সিং, কাঁপছে বলিপাড়া
পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, বিষ্ণোই গ্যাংয়ের টার্গেট কেবল সালমান বা টাইগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই গাংটি অভিনেতা রণবীর কাপুরের বান্দ্রার বাসভবনেও গোপনে রেকি বা নজরদারি চালিয়েছিল। এছাড়া অভিনেতা রণবীর সিংয়ের টিমের কাছেও ১০ কোটি রুপির বিশাল অঙ্কের চাঁদাবাজির হুমকি পাঠানো হয়েছিল। নির্মাতা রোহিত শেঠির জুহুর বাসভবন এবং অভিনেতা আমির খানকেও বিভিন্ন অডিও ও সামাজিক মাধ্যমের বার্তায় লাগাতার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কমেডিয়ান কপিল শর্মার কানাডার ক্যাফেতে হামলা করা ছাড়াও মুনাওয়ার ফারুকি ও গুরু রানধাওয়ার মতো বিনোদজগতের বহু তারকাকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট।
বুলেটপ্রুফ গাড়ির হিড়িক ও কমান্ডো পাহারা টাইগার শ্রফের ওপর হামলার পর গোটা মুম্বাই ফিল্ম সিটিতে এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা। বলিউড তারকাদের জীবনযাপনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সালমান খান ইতিমধ্যেই দুবাই থেকে প্রায় ২ কোটি রুপি মূল্যের বিশেষ বিস্ফোরক- ডিটেক্টর সেন্সরযুক্ত বুলেটপ্রুফ নিসান পেট্রল এসইউভি আমদানি করেছেন। পাশাপাশি তার 'বিগ বস ১৮-এর সেটে প্রায় ৬০ জন সশস্ত্র রক্ষী ও কড়া আধার কার্ড ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রবেশের নিয়ম করা হয়েছে।
সালমানের পর এবার অভিনেতা অক্ষয় কুমারও তার বাসভবনে উচ্চ ক্ষমতার বুলেটপ্রুফ গ্লাস শিল্ড স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন। মুম্বাই পুলিশ সালমান ও অক্ষয় কুমারের সুরক্ষায় আধুনিক সাব-মেশিনগানধারী বিশেষ কমান্ডো মোতায়েন করেছে। এছাড়া অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান এবং আমির খানের বাড়ির সামনেও সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। জনসমক্ষে তারকাদের যাতায়াত এবং ছবির প্রোমোশনাল ইভেন্টগুলো প্রায় বাতিল বা সীমিত করা হয়েছে।
কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি থেকেও যেভাবে লরেন্স বিষ্ণোই পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে আতঙ্কের চাদরে ঢেকে রেখেছে, তা সত্যিই নজিরবিহীন। রুপালি পর্দার যেসব নায়কদের পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে দেখা যায়, তারাই আজ বাস্তব জীবনের এক ভিলেনের ভয়ে তটস্থ। বলিউড কি পারবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই নতুন থাবা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে, নাকি বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাচের আড়ালেই বন্দি থাকবে রুপালি জগতের ভবিষ্যৎ-এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বোম্বে টকিজের অন্দরে।