রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ এলাকায় চাঁদাবাজি, মারধর ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচিত মো. ইসমাইল হোসেন বাবু ওরফে মোফা বাবুকে (৩০) আবারও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত দুই বছরে তিনি অন্তত সাতবার গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাকে গ্রেপ্তার করে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। এ ঘটনায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) থানায় নতুন একটি মামলা করা হয়েছে।
মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩৮৫, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় বেআইনি সমাবেশ, পথরোধ, মারধর, চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ ও মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, মোফা বাবুর গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার রামকেশব এলাকায়। তিনি রাজধানীর খিলক্ষেতের টানপাড়া এলাকার ১০ নম্বর সড়কের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিকুঞ্জ-২ এলাকায় চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর ও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন মোফা বাবু। এসব অভিযোগে একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আবারও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই ও অক্টোবরে এক ব্যবসায়ীর দোকান ভাঙচুর, চাঁদা দাবি ও মারধরের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নিকুঞ্জ-২ এলাকার একটি রেস্তোরাঁর সামনে থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক হওয়ার তথ্যও রয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর হাতেও একাধিকবার আটক হয়েছেন তিনি। এসব ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে মোফা বাবুর বিরুদ্ধে। তিনি খিলক্ষেতের ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব হিসেবে পরিচিত। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় বিএনপি নেতা জহির বাবু ওরফে ‘সিলটি বাবু’র আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তিনি নিকুঞ্জ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, বারবার গ্রেপ্তার ও গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও মোফা বাবুর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো তথ্যও তাদের জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে দলের স্থানীয় পর্যায়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, মোফা বাবু গ্রেপ্তার হলে এলাকায় সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে। তবে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে আবারও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ ওঠে। এতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
মোফা বাবুর গ্রেপ্তারের বিষয়ে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, ‘চাঁদাবাজের কোনো দল নেই, চাঁদাবাজের একমাত্র পরিচয় সে চাঁদাবাজ ও অপরাধী। খিলক্ষেত থানা এলাকায় কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। অপরাধের সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন, আইনের চোখে সবাই সমান। প্রভাব বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অপরাধ পার পাওয়ার দিন শেষ।’
তিনি আরও জানান, নতুন মামলার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেতের বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত প্রতিটি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, বারবার গ্রেপ্তার ও জামিনের পরও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ ওঠা উদ্বেগজনক। এসব অপরাধের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা থাকলে, তা-ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।