দেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রিলিমিনারি প্রতিবেদনে শিশুদের রক্তে ক্ষতিকর ভারী ধাতু, বিশেষ করে সীসার উপস্থিতি নিয়ে একটি তথ্য উঠে এসেছে।
সাধারণত ধারণা করা হয়, দারিদ্র্যের কারণে অসচেতনতা ও পরিবেশ দূষণের শিকার নিম্নবিত্তের শিশুরা বেশি হয়।
তবে এই প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তেই সীসার ক্ষতিকর মাত্রা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ৩০ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।
শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা উদ্বেগজনক। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ক্ষতি করতে পারে সিসা। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষতির সব সময় তাৎক্ষণিক লক্ষণ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে সুস্থ দেখালেও তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে দেশের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনের ‘হেভি মেটাল এক্সপোজার এন্ড এনিমিয়া’ অধ্যায়ের তথ্যানুযায়ী, পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে শিশুদের রক্তে উচ্চমাত্রার সীসার উপস্থিতির হার নিম্নরূপ:
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে। অর্থাৎ এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা গবেষণায় নির্ধারিত সীমায় বা তার ওপরে।
তবে পরিবারের সম্পদ অনুযায়ী এ হারে বড় পার্থক্য রয়েছে। পরিবারের সম্পদ অনুযায়ী শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে তা ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।
দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থাৎ সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গবেষকেরা দেখেছেন, পরিবারের সম্পদের শ্রেণি যত ওপরে উঠেছে, শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষা, ঘরের অবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এ সম্পর্ক বজায় ছিল।
ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন বলেন, ধনী শিশুরা প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেতে পারে। এছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজস বেশি থাকে। এসব পণ্যে সিসা থাকতে পারে। ফলে পণ্যগুলোর সংস্পর্শ শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য পথ হতে পারে।
তবে গবেষণায় এসব উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে প্যাকেটজাত খাবার, আসবাব বা দেয়ালের রঙের কারণে ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি, এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না।
এদিকে ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে মনে করেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা।
এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা বেশি পায় জানিয়ে শিশুবিশেষজ্ঞ বলেন, বাসায় সাজসজ্জার নানা সামগ্রীও থাকে। এ ছাড়া পোলট্রির মুরগিকে দেওয়া খাবারে সিসা থাকতে পারে। অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন পরিবারের অনেক শিশু মুরগির মাংস বেশি খায়। এসব খাবারের মাধ্যমেও তাদের শরীরে সিসা প্রবেশ করা অস্বাভাবিক নয়।
শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে বিভাগভেদেও।
গত বছরের মিকসের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।
অপরদিকে বরিশালে এ হার ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।