পৃথিবীর এমন এক দ্বীপ রয়েছে, যেখানে বছরের প্রায় ৬৯ দিন সূর্য অস্ত যায় না। মধ্যরাতেও চারপাশ থাকে দিনের মতো আলোকিত। নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপ সোমারয়। একসময় দ্বীপটিকে বিশ্বের প্রথম ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে গড়ে তোলার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে বাস্তবে সেখানকার বাসিন্দারা ঘড়ির নিয়ম ছাড়াই জীবনযাপন করেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন গল্প।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দ্বীপটির মানুষের জীবনযাপন এবং সময়মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার প্রচারণার নেপথ্যের ঘটনা।
নরওয়ের ট্রমসো শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত সোমারয়। মাছ ধরার জন্য পরিচিত দ্বীপটিতে প্রায় ৩০০ মানুষের বসবাস। চারপাশে পাহাড়, সমুদ্রের খাঁড়ি, ছোট ছোট বন্দর আর রঙিন বাড়িঘর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে গ্রীষ্মকালে এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে।
২০১৯ সালে সোমারয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন প্রচার করা হয়, দ্বীপটির বাসিন্দারা ঘড়ির প্রচলিত নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসতে চান। বিশেষ করে গ্রীষ্মের দীর্ঘ সময়ে সূর্য অস্ত না যাওয়ায় তারা নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই জীবন কাটানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রচারণার অংশ হিসেবে দ্বীপের কাছের একটি সেতুর রেলিংয়ে বেশ কিছু হাতঘড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। স্থানীয় এক হোটেলমালিক বাসিন্দাদের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্র নরওয়ের পার্লামেন্টের এক সদস্যের কাছেও জমা দেন।
তবে পরে জানা যায়, পুরো উদ্যোগের পেছনে ছিল নরওয়ের সরকারি পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনোভেশন নরওয়ে’। মূলত পর্যটকদের আকৃষ্ট করতেই এমন প্রচারণা চালানো হয়েছিল। দ্বীপের অল্প কয়েকজন বাসিন্দা এতে যুক্ত থাকলেও অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানতেন না।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংস্থাটির প্রধানকে ক্ষমা চাইতে হয়। পরে সেতু থেকে ঝুলিয়ে রাখা ঘড়িগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়।
যে দ্বীপে ৬৯ দিন সূর্য ডোবে না
আর্কটিক বৃত্তের উত্তরে অবস্থিত সোমারয়ে প্রতিবছর ১৮ মে থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না বলে জানিয়েছে বিবিসি। এ সময় মধ্যরাতেও আকাশে সূর্য দেখা যায়। ফলে দিন ও রাতের স্বাভাবিক পার্থক্য অনেকটাই হারিয়ে যায়।
শীতকালে দেখা যায় ঠিক বিপরীত চিত্র। তখন দীর্ঘ সময় সূর্যের দেখা মেলে না। দিনের বেলাতেও অন্ধকারে থাকতে হয় বাসিন্দাদের।
তবে প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্য থাকলেও সোমারয়ের মানুষের জীবন পুরোপুরি সময়ের নিয়মের বাইরে নয়। এখানকার হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও স্কুল এখনো নির্ধারিত সময় মেনেই চলে।
দ্বীপে বেড়াতে যাওয়া পোলিশ পর্যটক এভা কাচিনস্কি বিবিসিকে জানান, সময়মুক্ত অঞ্চলের প্রচারণা শুনেই সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার। ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের জন্য ঘড়ির হিসাব ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু দ্বীপে পৌঁছে দেখেন, সেখানেও দোকান ও রেস্তোরাঁ নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি হোটেলের অভ্যর্থনাকক্ষও সারা রাত খোলা থাকে না। এতে প্রথমে কিছুটা হতাশ হন তিনি।
পরে অবশ্য ফোন বন্ধ রেখে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটিয়ে স্বস্তি পান এভা। তার মনে হয়েছে, সোমারয়ে সময়ের চাপ অন্য জায়গার তুলনায় কিছুটা কম।
ডাচ পর্যটক ওয়াউটার দে উইটও দ্বীপটির ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, মধ্যরাতে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন তিনি। তখনো আকাশে সূর্য উজ্জ্বল ছিল। ঘড়ি না থাকলে সময় বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ত।
সময়মুক্ত জীবনের ধারণা নিয়ে কী বলছেন বাসিন্দারা
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বীপটির অনেক বাসিন্দা সময়মুক্ত অঞ্চল নিয়ে প্রচারণায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাদের মতে, দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় সময়ের হিসাব প্রয়োজন।
স্থানীয় এক হোটেলকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিষয়টি মূলত মজার একটি ধারণা ছিল। গ্রীষ্মকালে দ্বীপের মানুষ এমনিতেই কিছুটা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করেন।
এ সময় দোকানে ক্রেতা না থাকলে মালিক মাছ ধরতে চলে যেতে পারেন। পরদিন স্কুল বন্ধ থাকলে শিশুরাও রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। অনেকে ছুটিতে থাকায় জীবনযাত্রার গতিও কিছুটা কমে আসে।
তবে এই স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু হওয়ায় বাসিন্দাদের অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। পর্যটকেরা দ্বীপের প্রকৃতি বা সংস্কৃতির চেয়ে সময়মুক্ত অঞ্চলের বিষয়টি নিয়েই বেশি জানতে চাইতেন।
ওই হোটেলকর্মীর মতে, কয়েক বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে প্রচারণার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সোমারয় পরিচিতি পেয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে গভীর রাতেও দ্বীপটির চারপাশ দিনের মতো আলোকিত থাকে। অথচ রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। বাড়িঘর নীরব, যানবাহনের চলাচলও কম। ফলে আকাশের আলো দেখে সময় অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত সোমারয় বিশ্বের প্রথম সময়মুক্ত অঞ্চল হয়ে ওঠেনি। বাসিন্দারাও ঘড়ির নিয়ম বাতিল করেননি। তবে টানা ৬৯ দিন সূর্য না ডোবার কারণে সেখানে দিন ও রাতের প্রচলিত ধারণা অনেকটাই বদলে যায়। আর প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে চলা দ্বীপটির ধীরগতির জীবনযাপন পর্যটকদের কাছে এখনো বিশেষ আকর্ষণ হয়ে রয়েছে।