সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়লেন প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুসিচ

দীর্ঘদিনের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে নির্বাচনের মাঠে নেমেই বড় সাফল্যের পথে সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা। দেশটির আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন দেশটির দীর্ঘদিনের নেতা প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুসিচ। এর মধ্য দিয়ে সার্বিয়ায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক শক্তির শাসনের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোটের নমুনা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভুসিচ জানান, ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন স্টুডেন্ট লিস্ট ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। বিপরীতে তার নির্বাচনি জোটের ঝুলিতে যেতে পারে ১০৫টি আসন। চূড়ান্ত ফল ঘোষণা না হলেও ভুসিচ বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে আমরা এই নির্বাচনে হেরে গেছি।’

বেলগ্রেডভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ফোনেট জানিয়েছে, ভুসিচের পরাজয় স্বীকারের ঘোষণার পরই স্টুডেন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। উল্লাসে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা। অনেককে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতেও দেখা যায়।

২০১২ সাল থেকে সার্বিয়ার ক্ষমতায় রয়েছে ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস)। তবে এবারের নির্বাচনে দলটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন জোট।

স্টুডেন্ট লিস্টের সংসদ সদস্য প্রার্থী রাদোমির সাইচিচ জানান, প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় সব ভোটকেন্দ্রেই ছাত্রদের জোট এগিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররা জিতেছে। তাদের সঙ্গে জিতেছে এমন একটি সার্বিয়ার আশা, যেখানে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা থাকবে।’

সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের নভেম্বরে। ওই সময় দেশটির নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এ ঘটনার দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরে সেই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। যদিও ভুসিচ ও তার দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীরা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট, স্টুডেন্টস উইন’ নামে নির্বাচনি জোট গঠন করেন। এতে চিকিৎসক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে প্রার্থী করা হয়। তাদের অনেকেরই আগে সক্রিয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা ছিল না। দুর্নীতি প্রতিরোধ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালায় জোটটি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলও নিজেদের প্রার্থী না দিয়ে ছাত্রদের সমর্থন জানায়।

এদিকে এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। কমিশনের হিসাবে, ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর এটিই দেশটিতে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।

নির্বাচনে প্রায় ৬৫ লাখ ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। পার্লামেন্টের ২৫০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি জোট। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ১২৬টি আসন।

তবে নির্বাচন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সিআরটিএ জানিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ৫০০টি ভোটকেন্দ্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভোটার কিংবা নির্বাচনি কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগও করেছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সিইএসআইডি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত তারা সম্ভাব্য অনিয়মের প্রায় ২৬০টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ভোটের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়া এবং ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ে সমস্যার অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের কাছে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জামসহ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকটি সড়কে ব্যারিকেডও দেওয়া হয়।

এদিকে ভুসিচের পরাজয় স্বীকারের পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ সার্বিয়ার বিভিন্ন শহরে আনন্দ মিছিল বের করেন ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকেরা। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে জড়ো হন হাজারো মানুষ। অনেকে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে হর্ন বাজিয়ে ও স্লোগান দিয়ে বিজয় উদ্‌যাপন করেন।

কেন্দ্রীয় বেলগ্রেডের একটি পার্কে ভুসিচের সমর্থকদের এক বছরের বেশি সময় ধরে টানিয়ে রাখা তাঁবুও সরিয়ে ফেলেন উল্লসিত জনতা।

বেলগ্রেডের বাসিন্দা দ্রাগানা কোভেচেভিচ বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, চারপাশে সবাইকে হাসিমুখে একে অপরকে অভিবাদন জানাতে দেখে তিনি আনন্দিত। তার আশা, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সার্বিয়া একটি স্বাভাবিক ও মুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।

সূত্র: আল-জাজিরা