ঘাসফড়িং

 ‘তুই ঘাসফড়িংয়ের চেয়ে ছটফটে। তোর ছটফটানির জন্য ফড়িংটা...’ বলতে বলতে ছোটমামা ছুট দিল। ঘাসফড়িংয়ের পেছনে। বনিও ছুটল ছোটমামার পেছনে। ছুটতে শিখে ছোটমামার পেছনে ছুটে ছুটেই জীবন পার করছে সে। মা দুষ্টুমি করে বলেন—‘ছোটামামা’।

জন্মের পর থেকেই বনি নানাবাড়িতে। বাবা মক্কার রিয়াদে ফলের দোকানে চাকরি করেন। বনির এই ছ বছর বয়সে বাবা মাত্র তিনবার দেশে এসেছেন। বাবা দেশে থাকেন না বলেই মা তাকে নিয়ে গ্রামে নানাবাড়িতে থাকেন। আর খানিকক্ষণ পর পর আফসোস করেন, গ্রামে থেকে সে গেঁয়ো ভূত হয়ে যাচ্ছে। মা’র বড় শখ শহরে ‘হাইফাই’ থাকার। বনিকে নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করাবেন। তাদের বংশে কেউ ফটফট করে ইংলিশে কথা বলতে পারে না। বাবা টুকটাক কাজ চালানোর মতো বলতে পারলেও তাতে মানুষ হাসে। বনি বাবার মতো হবে না, ইংলিশম্যান হবে। বাবা এক্কেবারের জন্য দেশে এলেই সেটা হবে। তার আগ পর্যন্ত তাকে ছোটমামার পেছনে ছুটতে হবে।

রঙচঙে প্রজাপতি দেখে বনি ফড়িংয়ের পেছনে ছোটা বাদ দিল। ছোটমামা ঠিকই সবুজ পাতা রঙের ছটফটে ফড়িংটাকে ধরে ফেলবে। ছোটমামার হাতে জাল দিয়ে বানানো ফাঁদ। বনির হাতেও একটা আছে। বাঁশের কঞ্চির ডগায় মোজার মতো করে জাল দিয়ে বানানো। ফড়িং ছটফটানি শেষে গাছের পাতায় বসলেই হলো। খুব ধীরস্থির থেকে শিকারির মতো চুপটি করে ফাঁদটা ফড়িংয়ের ওপরে ধরে রাখতে হয়। ছটফটে স্বাধীনচেতা ফড়িং একটুও স্থির থাকতে পারে না। লাফ দিতেই ফাঁদের জালে আটকা পড়ে। তখন ধরে হাফপ্যান্টের পকেটের ছিপি আঁটা বোতলে রেখে দেয়। ওগুলো বোতলবন্দি থাকে।

বনির একটা পোষা শালিক আছে। শালিকটা লোহার শিকের খাঁচায় থাকে। সেই শালিকের খাবার হিসেবেই ফড়িং ধরা। শালিক পোকামাকড় খেতে পছন্দ করে। সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে ফড়িং খেতে। মামা ভাগ্নে মিলে গোটা বিশেক ফড়িং সারা বিকেলে ধরে ফেলেছে।

বনি রঙিন প্রজাপতির পেছনে ছুটছে। প্রজাপতিও মজা পেয়ে বনিকে খেলাচ্ছে। বসছে এ গাছ থেকে ও গাছে। এ ঝোপ থেকে ও ঝোপে। হঠাত্ বাড়ির দিক থেকে মায়ের গলা শোনা গেল, ‘বনি, বনি, শিগগিরই এদিকে আয়। দেখে যা কে এসেছে!’

বাবার সঙ্গে বনিরা ঢাকায় চলে এসেছে। বাবা মাকে সারপ্রাইজ দিতে আগ বাড়িয়ে কিছুই জানাননি। বিদেশ থেকে একেবারে সব গুছিয়ে বিদেশের পাট চুকিয়ে এসেছেন। তারা ঢাকায় থাকবেন। বাবা ব্যবসা করবেন।

অপরিচিত শহরে দুরন্ত বনি বোকার মতো হয়ে গেল। কিচ্ছু ভালো লাগে না তার। এখানে কিছুই নেই। নেই মাঠ, নেই গাছপালা। নেই ছোটাছুটি করার জায়গা। ছোটমামা নেই। শালিক নেই। ঘাসফড়িং নেই। প্রজাপতি নেই। দু রুমের ফ্লাটের জানালা দিয়ে চোখ খুললে অন্যবাড়ির দেয়াল। আকাশ নেই। দুরন্ত বাতাস নেই। তার দস্যিপনাও নেই।

কয়েকদিনেই বনি হাঁপিয়ে উঠল। কিছু বলতে পারে না। শুধু দিন দিন নেতিয়ে পড়ে। বাবা একটা নামী স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। সেখানেও ভালো লাগে না। সব চালবাজদের দল স্কুলে।

বনি অসুখে পড়ল। কী অসুখ কেউ ধরতে পারে না। শিশুর বড় ডাক্তাররাও না। সে দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগল। একজন বড় শিশু ডাক্তার তার বাবাকে পাগলের ডাক্তারের কথা বললেন। সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? হবে হয়তো। পাগলামির প্রথম লক্ষণ এরকমই থাকে মনে হয়। সে তো আগে কখনো পাগল হয়নি। জানে না।

বয়স্ক পাগলের ডাক্তারটা খুব হাসিখুশি। তিনি বাবা-মাকে রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে অপেক্ষা করতে বললেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে অনেক রকম খেলনা বের করলেন। কিন্তু বনি ওসব ছোটদের খেলনা দিয়ে কী করবে? তার দরকার দুরন্তপনা, দরকার সবুজ গাঁ। ঘাসফড়িংয়ের পেছনে ছোটা। ডাক্তার তার সঙ্গে অনেক গল্প করলেন। গ্রামে সে কী কী করত জেনে নিলেন।

বাবা-মাকে ঢুকতে দিয়ে বললেন, ‘গ্রামের মুক্ত পরিবেশ থেকে শহরের বদ্ধ খাঁচায় এসে ও হাঁপিয়ে উঠেছে। মানিয়ে নিতে পারছে না। আমার কি মনে হয়, ওকে আবার দিন কতকের জন্য গ্রামে নিয়ে যান। তারপর দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। যখনই ওরকম মন খারাপ থাকবে গ্রামে নিয়ে যাবেন।’

গ্রামে ফিরে এসে বনির অসুখ ভালো হয়ে গেল।

ছোটমামার পেছনে শালিকের জন্য ফড়িং ধরে নয়, বরং খাঁচায় বন্দি শালিকটাকে ছেড়ে দিয়ে। ছেড়ে দিয়েছে বোতলবন্দি আধমরা ফড়িংগুলোকেও।

খাঁচায় বন্দি হয়ে বনি পাগল হতে চলেছিল। বনের পাখি আর ঘাসফড়িংও কি এতদিনে পাগল হয়ে যায়নি?