হাত বাড়ালেই বন্ধু, হাত বাড়ালেই প্রতিভা

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ থেকে শুরু করে, এখন পর্যন্ত স্যাটেলাইট টিভিতে যেসব রিয়েলিটি শো প্রচারিত হয় কিংবা যেসব ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে, সেখানে অনেক মেধাদীপ্ত মুখ দেখে আমরা চমত্কৃত হই। মুগ্ধ হই। সেইসব প্রতিভাদীপ্ত চেহারা যে বয়সেরই হোক না কেন!

আমরা এমনটি দেখেছি, নতুন কুঁড়িতে খুবই ছোট বয়সে চমক লাগিয়েছেন এবং পরবর্তীসময়ে তারা দেশের জন্য অনেক বড় প্রতিভা হিসেবে আলো ছড়িয়েছেন। অনেক সম্মান বয়ে এনেছেন তাদের মেধার বিকাশের মধ্য দিয়ে!

এমনও হয়েছে, কেউ কেউ একসময় হারিয়ে গেছেন। তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একাত্তরের চলচ্চিত্রের জন্যও কথাটি প্রযোজ্য। একাত্তরের আগে বা পরে তা প্রযোজ্য। সেইসব ছবির নায়ক-নায়িকাকে আমরা যারা অভিনয় করতে দেখেছি, তাদের প্রাঞ্জল অভিনয় আমাদের মুগ্ধ করেছে।

কমবয়সী শিল্পীর কাজ দেখে মনে হয়েছে, এই শিল্পীরা ভবিষ্যতে অনেক বড় শিল্পী হবেন। কিন্তু বাস্তবজীবনে আমরা অনেককেই শেষ পর্যন্ত তেমন দেখতে পাইনি।

পাশাপাশি পরবর্তী পর্যায়ে, আমরা বড়পর্দায় কিংবা ছোটপর্দায় অনেক প্রধান চরিত্রের শিল্পীদের পেয়েছি। নায়ক হিসেবে। নায়িকা হিসেবে। আগে তাদের কোনো পরিচিতিই ছিল না।

ছিলেন তারা মফঃস্বল থেকে আসা একেবারেই সাধারণ কোনো মানুষ। এসেছেন অন্য কোনো পেশা থেকে। এসে তারা ম্যাজিকের মতো দর্শকের মন জয় করে নিয়েছেন। তেলেসমাতির মতো সব ঘটনা ঘটেছে।

এমন উদাহরণ অসংখ্য। শত শত।

নতুন কুঁড়ির একটি মেয়ের কথা বলা যাক। সাজিয়া আফরিন। বিদ্যুতের মতো চমক দিল। আবার হঠাত্ করেই মেয়েটি হারিয়ে গেল।

রোকসানা সাফা। বিয়ের পর চলে গেল লন্ডনে। এরপরে ওকে আর আমরা খুঁজে পেলাম না।

পরে এক-দুটি অনুষ্ঠানে ঝলক দিয়েছে ঠিক, কিন্তু প্রথম আসা মাত্র যেমন চারপাশে আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল, তেমনভাবে ওর উপস্থিতি আর পাওয়া যায়নি।

তারও আগে মাস্টার সেলিম।

টেলিভিশনের পর্দা মানে মাস্টার সেলিম। কিংবা রিপন। আরেকটু পরে মাস্টার মুজিব!

এদেরকে বলা হতো টেলিভিশনের প্রাণ।

তখন লাইভ অনুষ্ঠান হতো টেলিভিশনে। বলা হতো, এদেরকে কোনো ছোটদের অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হলে, সাফল্যের সঙ্গে তা করে ওরা বেরিয়ে আসবে।

সেলিম-পপলুরা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খ্যাতনামা ডাক্তার। হয়তো তারা সেভাবে নিজেরাই আজ আর মনেও করতে পারেন না, একসময় টেলিভিশনে কী দুর্দান্ত কাজ করেছিলেন তারা। মাতিয়ে রেখেছিলেন সারাদেশের মানুষকে।

আরো পরবর্তী পর্যায়ে শিপলুসহ অনেকের নাম আমরা উচ্চারণ করতে পারি।

একমাত্র তারানা হালিমকে বলতে পারি, নতুন কুঁড়ি নাড়িয়ে দিয়ে এসে রাজনীতি করছেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন কৃতিত্বের সঙ্গে। এখনো অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন।

তবে এ রকম নাম খুব একটা উচ্চারণ করবার মতো পাওয়া যায় না।

যেখানে নতুন কুঁড়িতে বিরাট আয়োজন করে অডিশন হতো, সারাদেশ থেকে অনেক প্রতিভাদীপ্ত প্রতিযোগী আসত, এখনকার রিয়েলিটি শো-তে যা ঘটে, সেখান থেকে একজন কি দুজন বেরিয়ে আসে, এখন যে বেরিয়ে আসছে, তা আমার জানা নেই।

এ ব্যাপারে যারা গবেষণা করেন, করেন নিরীক্ষা, লেখেন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র তারাই পারবেন সঠিক উত্তরটি দিতে। কেন এই প্রতিভারা হারিয়ে যায়—এর বৈজ্ঞানিক উত্তর হয়তো আছে তাদের কাছেই।

রুমানা চৌধুরী। পড়াশোনায় বেশ ভালো। সৃজনশীল লেখিকা। ভালো খেলাধুলায়ও। চৌকস ছিলেন টিভি অনুষ্ঠানে। উপস্থাপনা, আবৃত্তি, বিভিন্ন কার্যক্রমে ছিলেন তুলনাহীন।

সেই মানুষটি তার পরবর্তী জীবন সীমিত করেছেন শুধুমাত্র লেখক হিসেবে। নতুন জীবন শুরু করলেন সুদূর কানাডায়। সেখানে জীবন সচ্ছল হয়েছে। সুখ এসেছে। এসেছে দাম্পত্য জীবনে আলোময়তা।

কিন্তু এই টিভি ব্যক্তিত্বের নতুন করে আর যে বড় কোনো উত্থান ঘটেছে তা বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ছেড়ে, বাংলা ভাষাভাষীর পরিমণ্ডলে বিশাল কিছু করছেন সেরকম মনে হয় না। যদিও মানুষটি তার লেখালেখির জগত্টাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়ায় সচেষ্ট, বাংলা-ইংরেজি দুটি ক্ষেত্রেই সমুজ্জ্বল এই নারীব্যক্তিত্বের জগত্।

সামিরা আব্বাসী, আব্বাস উদ্দীনের নাতি। দামাদাম মাস্কালান্দার গানটি গাওয়ার সময় ক্যামেরার সামনে ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারছিল না। সে এতই ছোট ছিল যে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনিও মাঝেমধ্যে দেশে আসেন। খুব যে সফলতা পেয়েছেন এই অনিয়মিত আসা-যাওয়ার পথ পরিক্রমায়, এটা বলা যাবে না। বরং বলা যেতে পারে, আব্বাস উদ্দীনের নাতি হিসেবে তার যে পরিচিতি সেটাকে হয়তো তিনি যথার্থ মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেন দেশে ও বিদেশের মাটিতে! নিজের প্রতিভাকে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করেন প্রাত্যহিক জীবনে।

আল মনসুরের কথায় আসি।

কী দুর্দান্ত ছিল আল মনসুর-রিটা’র জুটি। জনপ্রিয় জুটি। আলোচিত জুটি। এককথায় অতুলনীয়।

‘জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে।’

এমন এক শ্রুতিনন্দন সংলাপ আল মনসুর তখন সবার মুখে মুখে কাছে ছড়িয়ে দেন। 

টিভিতে একটা নাটক বানিয়েছিলেন। একদিনের নোটিসে সেই নাটক বানিয়ে চমকে দিয়েছিলেন দর্শকদের।

এক ক্যামেরায় এখন আউটডোর টিভি প্রোডাকশন হয়। তখন হতো তিন ক্যামেরায়। স্টুডিওর ঘেরাটোপে। সেই আল মনসুর এক ক্যামেরা নিয়ে অনেক অনেক বছর আগে চলে যান ঢাকার বাইরে। এক ক্যামেরায় ধারণ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সিনেমার ফর্মুলা অনুসরণ করে আল মনসুর সেই প্রযোজনায় সাফল্যও পান।

একদিনে নাটক লিখে, শিল্পীদের নিয়ে মহড়া দিয়ে, শ্যুট করে, সম্পাদনা শেষে সেই নাটক প্রচার করা। কী দুঃসাহসী ছিলেন আল মনসুর। দুঃসাহস দেখিয়ে সফলতা এনেছিলেন এই নির্মাতা-অভিনেতা!

আল মনসুর আবারও সচেষ্ট, টিভি-চলচ্চিত্রে সুঅভিনেতার ইমেজ তুলে ধরার জন্য।

কিন্তু যে প্রতিভার স্ফুরণ দেখেছি এই মানুষটিতে, জানি না এতবছর পর এখন সেই প্রতিভার স্বাক্ষর আর রাখা সম্ভব কি না!

প্রতিভাবান এমন আরো অনেকের নাম আসতে পারে।

শিমুল ইউসুফ শিশুশিল্পী হিসেবেই আলোচিত ছিলেন। পরে মঞ্চে দোর্দণ্ড প্রতাপে কাজ করেন। মিতা চৌধুরীও অনেক নাটক করেছেন।

সবার নাম এ লেখায় হয়তো তুলে ধরা সম্ভবও হচ্ছে না। কালের পরিক্রমায় আমাদের স্মরণে তা থিতিয়ে গিয়েছে। ধুলো পড়ছে স্মৃতির আয়নায়। দেশে বিএ-এমএ ডিগ্রি, ব্যারিস্টার, ডাক্তার, প্রকৌশলী অনেক আছেন। কিন্তু শিল্পের প্রতিভা জন্ম নেন সামান্যই।

বলতে পারি, প্রতিভাবানরা যেভাবে উত্থান ঘটিয়েছেন, আলোড়ন তুলেছিলেন চারপাশে, সেই ঢেউ তুলে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তা তারা আর ধরে রাখতে পারেননি। বিকাশটাও ঘটেনি।

জীবনের প্রয়োজনে অন্য ক্ষেত্রে ব্যস্ততা বেছে নিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ভাবার সময় এসেছে, প্রতিভাকে লালন করার জন্য, ধারণ করার জন্য, আরো আরো বড় করার জন্য, তার বাস্তব জীবনকে অনুভব করার জন্য, দায়িত্বশীল হতে হবে আমাদেরকে আরো একটু।

শিল্পীকে উত্সাহ দেওয়ার জন্য আমাদের হাত বাড়ানোটা, শক্ত হাত বাড়ানোটা আরেকটু দরকার। যাতে শিল্পীরা শেষ পর্যন্ত হারিয়ে না যায়!