মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বাহিনী। সোমবার প্রকাশিত সিএনএনের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
একদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের চেষ্টা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি—দুইয়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের বৈঠকে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপসচিব আলী বাঘেরি কানি, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন অংশ নেন।
বৈঠক শেষে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সংলাপ ও আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। সফরকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলিও প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান সংকটে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠকের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ক্রিমলি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেছেন, অঞ্চলের দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে বাঘায়ি বলেন, নিজেদের সক্ষমতা ও উদ্যোগের ভিত্তিতে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে এ ধরনের বৈঠক। কয়েক দশক ধরেই ইরান এ নীতির ওপর জোর দিয়ে আসছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর স্বার্থ ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে তেহরান।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরে বাঘায়ি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন আলোচনার নামে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে চায়। তাঁর ভাষ্য, গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে আলোচনার প্রতি আন্তরিকতার অভাব দেখা গেছে।
তবে কূটনীতির পথ বন্ধ করেনি ইরান—এমন দাবি করে তিনি বলেন, নিজেদের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে কূটনীতির প্রতি তাদের অঙ্গীকার আন্তরিক ও অবিচল।
আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির খবর সামনে এসেছে। সোমবার প্রকাশিত সিএনএনের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ও পেন্টাগন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি বিস্তৃত তালিকাও তৈরি করেছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি এবং জ্বালানি অবকাঠামো রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই অভিযান সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সামরিক স্থাপনায় চালানো সীমিত হামলার তুলনায় অনেক বড় পরিসরের হতে পারে। আগের অভিযানগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা এবং দ্রুত প্রতিস্থাপনযোগ্য সামরিক সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। নতুন পরিকল্পনায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর আরও ব্যাপক আঘাত হানার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, সম্ভাব্য অভিযানটি বড় ধরনের হতে পারে। তবে সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকা এবং বাস্তবে হামলার নির্দেশ দেওয়া এক বিষয় নয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশের ধারণা, চলতি বছরের শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প আবারও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন মনে করেন, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।
তবে এসবই কর্মকর্তাদের ধারণা ও সম্ভাব্য পরিকল্পনাসংক্রান্ত তথ্য। ট্রাম্প এখনো ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। এর আগেও বড় সামরিক অভিযান অনুমোদনের কাছাকাছি গিয়ে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন তিনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা প্রতিরক্ষা বিভাগের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। ফলে কোনো পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে বলেই প্রেসিডেন্ট হামলার নির্দেশ দিয়েছেন, এমনটি ধরে নেওয়া যায় না।
এদিকে গত রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরানে তাৎক্ষণিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আজ কোনো হামলা হবে না।’
সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের আলোচনায় আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যেমন সামনে এসেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান ঘিরে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। আগামী দিনে কূটনৈতিক আলোচনা কতটা এগোয় এবং ওয়াশিংটন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।