আগামী ই-ক্যাব নেতৃত্বের কাছে একজন সাধারণ সদস্যের কয়েক দফা প্রত্যাশা

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশে ই-কমার্স খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ, ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখা এবং টেকসই ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসন্ন ই-ক্যাব নির্বাচন ২০২৬–২০২৮ সামনে রেখে সংগঠনটির একজন সাধারণ সদস্য ও ই-কমার্স উদ্যোক্তা হিসেবে আগামী নেতৃত্বের কাছে কয়েক দফা প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন যাচাই ডট কম লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ। তাঁর মতে, ই-ক্যাবকে কেবল আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর ও কার্যকর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে তার প্রস্তাবনাগুলো হলো:

- সরকারি নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ই-কমার্স রোডম্যাপ প্রণয়ন, ডিবিআইডি ও ট্রেড লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে।
- বিভাগীয় পর্যায়ে সদস্যসেবা: ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমিয়ে আট বিভাগে পর্যায়ক্রমে সেবাকাঠামো গড়ে তোলা, অনলাইন হেল্পডেস্ক চালু এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের নিবন্ধন, কর-ভ্যাট, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসায়িক পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে।
- বিক্রয় বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক সংযোগ: জাতীয় ও বিভাগীয় ই-কমার্স মেলা, সাশ্রয়ী স্টল বরাদ্দ, নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুযোগ এবং উৎপাদক, সরবরাহকারী ও অনলাইন বিক্রেতাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সংযোগ বাড়াতে হবে।
- যৌক্তিক কর-ভ্যাটনীতি: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সহজ কর পরিপালনব্যবস্থা, মার্কেটপ্লেস কমিশনের ওপর ভ্যাট কাঠামো পর্যালোচনা এবং আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ভ্যাট রেয়াত, রিফান্ড ও কর সমন্বয় সহজ করতে এনবিআরের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
- আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ: অ্যামাজন, ইবে ও এটসির মতো আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, ক্ষুদ্র পার্সেল রপ্তানি সহজ করা এবং বৈধ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট, কাস্টমস ও লজিস্টিকস প্রক্রিয়া সহজীকরণে উদ্যোগ নিতে হবে।
- অর্থায়ন ও পেমেন্ট সুবিধা: বিক্রয় ও লেনদেনের তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, এসএমই অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, যৌক্তিক মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট এবং এসক্রো, রিফান্ড ও মার্চেন্টের পাওনা অর্থ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
- কুরিয়ার ও লজিস্টিকস ব্যবস্থায় ন্যায্যতা: ডেলিভারি, পণ্য হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রিটার্ন, ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) নিষ্পত্তি ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
- নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ উন্নয়ন:এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের নিবন্ধন ও ব্যবসায়িক পরামর্শ, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
- সুশাসন ও জবাবদিহি: সদস্যদের জন্য ওয়ান-স্টপ হেল্পডেস্ক, সময়সীমাবদ্ধ অভিযোগ নিষ্পত্তি, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিপরীতে সময়সীমাসহ বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
- নারী উদ্যোক্তা ও সফল ব্যবসায়ীদের স্বীকৃতি: নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণে সহায়তা এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ননীতির ভিত্তিতে প্রতিবছর ই-কমার্স উদ্যোক্তা সম্মাননা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান, গ্রাহকসেবা, সততা ও আন্তর্জাতিক বাজারে অবদানের ভিত্তিতে উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।

প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ মনে করেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে তার বাস্তবায়নই আগামী নেতৃত্বের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত। তাঁর প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব ক্ষুদ্র-বড়, নতুন-অভিজ্ঞ, নারী-পুরুষ এবং রাজধানী ও প্রান্তিক অঞ্চলের সব উদ্যোক্তার স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দেবে। 
তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণের পাশাপাশি ভোক্তার আস্থা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, তথ্যের নিরাপত্তা ও আইনসম্মত ব্যবসা পরিচালনার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ই-ক্যাবের প্রতিটি উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে সদস্যদের ব্যবসায়িক সুফল, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বাজার সম্প্রসারণ এবং সমস্যা সমাধানে বাস্তব অগ্রগতির ভিত্তিতে। এজন্য আগামী নেতৃত্বকে পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশের মাধ্যমে সদস্যদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে ই-ক্যাব উদ্যোক্তাদের আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠবে এবং বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতকে আরও শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।