সরকারের নির্দেশ পেলে ‘ক্রসফায়ার’ করার ঘোষণা দেওয়ায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে সরে যাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, কেবল আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনাই যথেষ্ট নয়, এমন বক্তব্যের পর আইজিপির ওই পদে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার আর অবশিষ্ট নেই। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে আমূল সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে গাজীপুর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এনসিপির সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইজিপির বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, আইজিপির পদে থাকার আর কোনো অধিকার নাই। আমরা ইতিমধ্যে আইজিপির অপসারণ চেয়েছি। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে তাঁর দায়িত্ব থেকে চলে যাওয়া উচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে যার দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করার কথা ছিল, তিনি প্রকাশ্যেই বলছেন সরকার নির্দেশ দিলে ক্রসফায়ার করবেন। শেখ হাসিনার আমলেও তো আমরা এভাবে কাউকে খুল্লামখুল্লা এমন কথা বলতে দেখিনি। ফলে পুলিশ বাহিনীর যে গভীর সংস্কার প্রয়োজন, তা এই বক্তব্যেই স্পষ্ট।’
উল্লেখ্য, গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সভায় নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারা আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছেন। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে না পারে, তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন উভয়ই ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণিত হবে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের মতো আবারও দলীয়করণের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচনের চেষ্টা করা হলে রাজপথে নেমে কঠোর প্রতিরোধের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রবণতার সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, সরকার ধীরে ধীরে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী আচরণের দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে বিএনপির দলীয় লোকজনকে বসানো হচ্ছে। পুলিশের প্রধান প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের হুমকি দিচ্ছেন। কেউ গঠনমূলক সমালোচনা করলেই তাঁর বিরুদ্ধে নির্বিচারে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের সর্বত্র এভাবে নগ্ন দলীয়করণ চলতে থাকলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
সভায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাকশ্রমিকদের অবমূল্যায়নের কড়া সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি পোশাকশ্রমিকদের মানবিক জীবনযাত্রার স্বার্থে তাঁদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ এবং ঢাকা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা।
এদিকে সভা শেষে মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেড়াইদেরচালা এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণকারী শিক্ষার্থী মো. বাপ্পিকে দেখতে তাঁর বাড়িতে যান নাহিদ ইসলাম। সেখানে বাপ্পির পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাঁর পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ত্যাগের ফসল। আজ দেশে নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসার পেছনে রয়েছে হাজারো মানুষের জীবনদান, অঙ্গহানি আর চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। তাই রাজনৈতিক স্বার্থসহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এই আহত ভাইবোনদের পাশে দাঁড়ানো সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কোনো প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন তাঁদের চিকিৎসায় সামান্যতম গাফিলতি না হয়, সরকারকে তা কড়া নজরদারিতে নিশ্চিত করতে হবে।’