চালকদের আচরণ পরিবর্তনের কথা বললেই কিংবা গাড়ির ফিটনেসের কথা বললেই কারও কারও গাত্রদাহ (গায়ের জ্বালা) হয় বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আমাকে কেউ যদি বলতে পারেন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এই কাজটি বা কাজগুলো করলেই সড়কে একটি প্রাণও ঝরবে না, আমি তা-ই করব। আমাকে বলেন, কোন কাজটি করলে সড়কে একটি প্রাণও যাবে না। নিশ্চয়ই সেই দায়িত্ব নিতে চাই, সরকার সেই দায়িত্ব নিতে চায়।’
আলোচনা সভায় বেশ কয়েকজন বক্তার বক্তব্যে উপস্থিত চালকরা মেজাজ হারিয়ে হৈই চৈই করলে সড়কমন্ত্রী বলেন, ‘আমার ধারণা, পরিবহন খাতের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যেভাবে মেজাজ হারাচ্ছেন, এভাবে মেজাজ যদি পরিবহনের স্টিয়ারিং সিটে বসে হারান, তাহলে দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। আমাদের শুনতে হবে, মানতে হবে এবং কাজ করতে হবে। আমরা কেউ কারও প্রতিপক্ষ নই। এখানে যারা আছি, সবারই দায়িত্ব হচ্ছে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করা।’
সড়কমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সমস্যা ঠিকই আছে। কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি ভ্যান উল্টে খাদে পড়ে গেল, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে, দুর্ভাগ্যবশত কেউ নিহত হলেন। এর দায় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের-এভাবে ভাবার জায়গাটাতেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রতিদিনই মানুষ সড়কে মারা যাচ্ছে। আশঙ্কাজনক হারে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু সব দুর্ঘটনাকেই আমরা সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছি।’
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের সচেতনতা ও দক্ষতার অভাব যে অন্যতম প্রধান কারণ, তা অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে রাতারাতি এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দক্ষ ও যোগ্য চালক প্রয়োজন, এটিও অবধারিত। কীভাবে আমরা তা নিশ্চিত করতে পারি, সে বিষয়ে মালিক সমিতির দায়িত্বশীল নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। তারাও পরিবর্তন চান। এই পরিবহন খাতের আমূল পরিবর্তনের জন্য তারাও এগিয়ে আসতে চান। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় রাতারাতি পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছে না। তার মানে এই নয় যে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছি। আমরা যে-কোনো মূল্যে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ইতোমধ্যে অনেক পদক্ষেপ, পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নাধীন। আমার বিশ্বাস, জাতিসংঘে গিয়ে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। সেই লক্ষ্যে আমাদের সফল হতেই হবে। দয়া করে, আমরা কেউ কারও ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসি। একজন বললেন, অটোরিকশা যেভাবে পুরো দেশকে, বিশেষ করে ঢাকা শহরকে জরাজীর্ণ করে ফেলেছে, সেটিকে আমরা সমর্থন করি না। ঠিক আছে, কিন্তু যারা সমর্থন করেন না, তাদের মধ্যে একজনও কি অটোরিকশায় ওঠা বন্ধ করেছেন?’
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘ফুটপাতে দোকান বসুক, চলাচল ব্যাহত হোক-এটা আমরা কেউ চাই না। কিন্তু আপনার আত্মীয়ের দোকান যদি নিয়মিত ফুটপাতে বসে, অথবা আপনার বাসার সামনে কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চলে, আপনি কি প্রতিবাদ করেছেন? অসহযোগিতা করেছেন? আমরা যদি নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন না করি, তাহলে দেশের আমূল পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা করছি, তা শুধু চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কার্যকর করা কঠিন হয়ে যাবে। জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে, নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
পরিবহন মালিক, শ্রমিক, প্রকৌশলী, পুলিশ ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোথায় কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রস্তাব দিলে সরকার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে নয়, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করলেই নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব।’