দেড় মিনিটে মন্ত্রীকে ৩৫ বার স্যার বলা ইউএনও এখন ‘ছুটি বিতর্কে’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ছুটির অনুমোদন ও কর্মস্থল ত্যাগের সময় নিয়ে গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম।

জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো তার ছুটির আবেদনপত্রে কোনো দৃশ্যমান সিল বা স্বাক্ষর না থাকা এবং আবেদনে উল্লেখ করা সময়ের সঙ্গে কর্মস্থল ত্যাগের সময়ে মিল না পাওয়ায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ইউএনওর অনুপস্থিতি এবং উপজেলাতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ শূন্য থাকায় মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরা।

গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) ও মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজারহাট ইউএনও কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কাজে এসে কর্মকর্তা না পাওয়ায় অনেক সেবাগ্রহীতাকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. হানিফ আলী ও মো. রাশেদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিভিন্ন জরুরি আবেদন নিষ্পত্তি ও স্বাক্ষরের জন্য এসে ইউএনওকে না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।

জেলা প্রশাসক বরাবর দাখিল করা ছুটির আবেদনপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, পারিবারিক কারণ দেখিয়ে ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের নৈমিত্তিক ছুটি চেয়েছেন তানজিলা তাসনিম। একই সঙ্গে ছুটির আগে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি প্রার্থনা করা হয়। তবে এই আবেদনপত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের সিল-স্বাক্ষর দেখা যায়নি, যার ফলে ছুটি আদৌ বৈধভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকারিয়া হোসেন দাবি করেছেন যে ইউএনও গত ২২ অক্টোবর ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন এবং আগামী বৃহস্পতিবার তার অফিসে ফেরার কথা রয়েছে। আবেদনপত্রের নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বাস্তব কর্মস্থল ত্যাগের এই পার্থক্যের কারণে ছুটির অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

নিয়ম অনুযায়ী ইউএনওর অনুপস্থিতিতে রাজারহাট উপজেলার রুটিন দায়িত্ব পালনের কথা কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসানের। তিনি জানান যে জেলা প্রশাসক তাকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন, তবে তার হাতে কোনো লিখিত দায়িত্ব অর্পণের কাগজ নেই। এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে তাকেও নিয়মিত রাজারহাট উপজেলায় পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথও গত ২২ অক্টোবর থেকে ছুটিতে থাকায় বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আসাদুজ্জামান অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, রাজারহাট ইউএনওর অনুপস্থিতি বা এসংক্রান্ত কোনো লিখিত অভিযোগ তার কাছে নেই, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউএনও তানজিলা তাসনিম ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক মন্ত্রীকে মাত্র দেড় মিনিটে ৩৫ বার ‘স্যার’ সম্বোধন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন এই কর্মকর্তা। এর বাইরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও থাকাকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পরিচয়ে এক পর্যটকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের হুমকির অভিযোগ ওঠার ঘটনাতেও তিনি সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন।

পরপর বিভিন্ন ঘটনায় বিতর্ক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও ছুটির এই অস্পষ্টতার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্তপূর্বক কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে কোনোভাবেই নাগরিক সেবা ব্যাহত না হয়।