এবার আইইডিসিআরে ‘মব’ করে পরিচালককে মারধর

কোনোভাবেই ‘মবে’র সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বারবার মবের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত ‘মব’ বন্ধ করা যায়নি। সর্বশেষ গতকাল বুধবার রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে কক্ষের ভেতরে কাজী আহমেদকে মারধর করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার রাতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।

এর আগে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সাতক্ষীরায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে কয়েক দফা মারধরের পর তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। সেখানে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এর কয়েক দিন আগেই রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সামনে আসে বিএনপি থেকে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের নাম। এছাড়া, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়, আদালতেও একের পর মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩৭টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছেন ২৫৬ জন আর আহত হয়েছেন ৫৭৫ জন। সংগঠনটি বলছে, গত বছর মবের এই সংখ্যা ছিল ৪২৮টি আর ২০২৪ সালে ছিল ১৬৯টি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবের ঘটনা প্রকট হয়ে ওঠে।

গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে কয়েক জন লোক আইইডিসিআরের পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করে তাকে মারধর করে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি বলেছেন, বিএনপিপন্থি চিকিত্সকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কর্মীরা মব সৃষ্টি করে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাজী আহমেদ নিজের কক্ষে কয়েক জন ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করছেন। এ সময় আট থেকে নয় জন লোক তার কক্ষে ঢোকেন। তারা কাজী আহমেদকে চেয়ার থেকে টেনে উঠিয়ে নিয়ে মারধর শুরু করেন। আইইডিসিআর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) মতো সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে।

বিএনপি সরকার আসার পর আইইডিসিআরের সর্বোচ্চ পদ, অর্থাত্ পরিচালক পদে অধ্যাপক কাজী আহমেদকে নিয়োগ দেয়। তিনি একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘ওর (কাজী আহমেদ) ও তো কিছু দোষ আছে।’ কী দোষ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই সরকারের সময় কাজী আহমেদ কী করে মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে তার নিজের অফিসে বৈঠক করে?’

জনস্বাস্থ্যবিদ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর; রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ছিলেন। তিনি করোনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্রিফিং করে বেশ পরিচিতি পান। পরে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান। কাজী আহমেদকে মারধরের সময় তার কক্ষে উপস্থিত থাকা একজন বলেন, যারা মারধর করেছেন, তাদের তিনি আগে কখনো আইইডিসিআরে দেখেননি।

এর আগে গত মঙ্গলবার রাজধানীর পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষার কাজে বাধা দিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। তারা মব সৃষ্টি করে মাটি পরীক্ষার সরঞ্জামবাহী দুটি গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লাগানো একটি সাইনবোর্ডও সরিয়ে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করা গবেষণা মাঠে সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে সোমবার রাতে আনন্দ মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হামলার এই অভিযোগ আনেন ছাত্র ও যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের কয়েক জনকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

মবের ঘটনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য : মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৭১ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮ আর গত বছর ছিল ১৯৮ জন। আর মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সারা দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এ সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন। কারাগারে মারা গেছেন ৯৫ বন্দি। এছাড়া, ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার এবং ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতার ১ হাজার ১৩৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৬৮ জন, আহত ৮৬১ জন। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মব সহিংসতার ঘটনা ও প্রাণহানি কমেছে।

এমএসএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতার ১৬৯টি ঘটনায় ১৪৬ জন নিহত ও ১২৬ জন আহত হন। ২০২৫ সালে ৪২৮টি ঘটনায় নিহত হন ৪৪৬ জন, আহত ১৬০ জন। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩৭টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন, আহত ৫৭৫ জন। সব মিলিয়ে এ সময় নিহত ও আহতের সংখ্যা ১ হাজার ৭২৯।

তবে পুলিশের হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চে সর্বাধিক ২৯টি মবের ঘটনা ঘটে। ঐ বছরের সেপ্টেম্বরে ১৮টি ঘটনায় নিহত হন ১৩ জন। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আগস্টে সর্বাধিক ১১টি ঘটনা ঘটে; এতে নিহত হন আট জন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, আগের তুলনায় মব সহিংসতা কমেছে। যে কোনো ঘটনায় সরকার তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা কমে আসছে।