স্লাভিক ইতিহাসের ওপর ৯০ মিনিটের দীর্ঘ বয়ান দিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের বিরক্ত করলেন পুতিন

ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতারা এক ফোনালাপে ৯০ মিনিট ধরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে ইতিহাস বিষয়ক বয়ান শুনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

অন্য দেশের নেতাদের সামনে রুশ প্রেসিডেন্টের এমন দীর্ঘ ও অসংলগ্ন ঐতিহাসিক বয়ান দেওয়ার এটি সর্বশেষ ঘটনা।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বরাতে টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টুব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের সঙ্গে ফোনালাপের বেশির ভাগ সময় পুতিন ‘মধ্যযুগের স্লাভ জাতির ইতিহাস’ নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। 

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর চেষ্টা হিসেবে এই ফোনালাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কথোপকথন সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে বলেছে, ‘ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপের বেশির ভাগ সময় ভ্লাদিমির পুতিন তাদের মধ্যযুগের স্লাভ জাতির ইতিহাস সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন। এতে রাশিয়ার সঙ্গে আসন্ন শান্তি আলোচনায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ইউরোপকে কী ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।’

সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, ফোনালাপটি মাত্র আধা ঘণ্টা চলার কথা থাকলেও তা ৯০ মিনিট ধরে চলে। পুরো কথোপকথনেই মূলত বর্তমান যুদ্ধের ঐতিহাসিক কারণ নিয়ে আলোচনা করেন পুতিন।

তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি নিয়ে সেখানে প্রায় কোনো অর্থবহ আলোচনা হয়নি। নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু হলে ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান দাবি হতে পারে এই যুদ্ধবিরতি।

যুদ্ধের অবসান নিয়ে রাশিয়া যে গুরুতর আলোচনা করতে খুব একটা আগ্রহী নয়, এটি তার সর্বশেষ ইঙ্গিত। চার বছর আট মাস ধরে এই যুদ্ধ চলছে।

পুতিনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলায় ইউরোপের ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন স্টোরে ও স্টুব। ২০২২ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করাকে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে অনেকটা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, ‘নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের এই উদ্যোগ নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, ইউরোপের এককভাবে উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত।

সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন জানিয়েছেন, তাকে এবং ইউরোপের অন্য নেতাদের এই আলোচনার বিষয়ে আগে থেকে জানানো হয়নি।

তবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা নিশ্চিত করেছেন, ফোনালাপটি তাদের সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল। পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগের এই উদ্যোগকে তিনি ‘সঠিক পদ্ধতি’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ফোনালাপ নিয়ে ক্রেমলিনের একটি বিবৃতিতে বলা হয় যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে নিরাপত্তা জোটের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল।

পুতিন জোর দিয়ে বলেন, যে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল তখনই সম্ভব যখন রাশিয়ার আইনি স্বার্থগুলো সম্পূর্ণ ও শর্তহীনভাবে বিবেচনা করা হবে।

এই ফোনালাপের সঙ্গে গত আগস্টে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠকের মিল রয়েছে। সেই বৈঠকেও দীর্ঘ ইতিহাসের আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছিল।

ইউক্রেনে দ্রুত শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করার আশায় ট্রাম্প ওই বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। এর আগে পুনর্নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন।

কিন্তু এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে দীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে হয়। সেই বক্তৃতায় নভগোরদের রুরিক ও ইয়ারোস্লাভ দ্য ওয়াইজের মতো মধ্যযুগের শাসকদের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।

পুতিন ১৭ শতকের কসাক নেতা বোহদান খমেলনিতস্কি সম্পর্কেও দীর্ঘ বক্তব্য দেন। দ্য আইরিশ টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ট্রাম্প এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে তিনি বৈঠক ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মনে করেন, এই তিন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ঘটনাপ্রবাহ এমন একটি বয়ানকে সমর্থন করে, যেখানে ইউক্রেনকে রাশিয়ার একটি প্রদেশমাত্র হিসেবে দেখানো হয়।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।

ক্রেমলিন বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনায় ইউরোপের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন না।

ক্রেমলিনের কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ বলেছেন, স্টুব ও স্টোরের সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপের সময় আলোচনায় ইউরোপের দেশগুলোর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো কথা হয়নি।