সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার ঝুঁকি এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একই সঙ্গে র্যাবের নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করলেও পুরোনো বাহিনীর সদস্য ও ক্ষমতা নতুন ইউনিটে স্থানান্তর করায় উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসব বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনটি আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। ২৬ অক্টোবর পাঠানো চিঠিটি গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সময় মন্ত্রীর সঙ্গে সংস্থাটির মহাসচিবের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় দেওয়া হয়েছে।
আইন তিনটি হলো সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন ২০২৬।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। অ্যামনেস্টির মতে, আগের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার খর্ব করতে ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন সংশোধনীতে সেই সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ানো হতে পারে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানি, অপমান, হয়রানি, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে অপরাধের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব অপরাধের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও ব্যাপক হওয়ায় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সরকারের সমালোচকদের হয়রানি বা তাঁদের কণ্ঠরোধে আইনটি ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি।
সংশোধনীর ৮(২) ধারায় অনলাইনে তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধে উসকানি, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানি কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি ‘অশ্রদ্ধা’ প্রকাশ করতে পারে, এমন তথ্য সরানো বা প্রকাশ বন্ধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির মতে, এসব বিষয়ের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হওয়ায় কর্তৃপক্ষের ইচ্ছামতো মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া, কোনো তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত বিধানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার সুযোগ রয়েছে। এসব কারণে সংশোধনীটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ প্রণয়নকে স্বাগত জানালেও এটিকে আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে না সংস্থাটি। আইনে গুমের শিকার ব্যক্তির সংজ্ঞা সংশোধনের সুপারিশ করেছে তারা।
অ্যামনেস্টির মতে, গুমের ঘটনায় কাউকে আটক করা এবং পরে তাঁর আটকের তথ্য অস্বীকার করা বা অবস্থান গোপন করার কাজ একই সরকারি কর্মকর্তাকে করতে হবে, এমন শর্ত রাখা উচিত নয়। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখার বিধানও বাতিল করা প্রয়োজন।
আইনটির ৬ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধানের বিরোধিতা করে এ দণ্ডের ওপর স্থগিতাদেশ এবং পরিপূর্ণ বিলোপের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া, ১৮ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার করার সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের। অ্যামনেস্টির মতে, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের বিচার ন্যায়বিচারের নীতিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
আইনটির ২১ ধারায় গুমের বিষয়ে ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ অভিযোগ করলে ক্ষতিপূরণ বা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অ্যামনেস্টির আশঙ্কা, এ বিধান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে অভিযোগ জানানো থেকে বিরত রাখতে পারে।
এসআরবি আইন নিয়ে সংস্থাটির প্রধান উদ্বেগ, র্যাবের নাম পরিবর্তন করা হলেও আগের বাহিনীর সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পদ নতুন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে। র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি।
সংস্থাটির মতে, আগের বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যাচাই-বাছাই না করেই নতুন ইউনিটে নেওয়া আইনের একটি বড় ঘাটতি। তাই তিনটি আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।