পাকিস্তানের ধারাবাহিক নাটক ‘দার-এ-নিজাত’ প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই চলছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে ধারাবাহিকের আবু বকর চরিত্রটি নারী দর্শকদের মধ্যে তৈরি করেছে ব্যাপক কৌতূহল। পুরুষদের অনেকেও নিজেকে তুলনা করছেন আবু বকর চরিত্রটির সঙ্গে। তার ভালো মানুষ—কারও কারও মতে, অতিরিক্ত ভালো মানুষ—হওয়ার বিষয়টি নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
নাটকটির লেখক উমেরা আহমেদও এ বিষয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তার অনুসারীরা কেন মনে করেন, ‘দয়া, সহমর্মিতা, ক্ষমা করা এবং অন্যের ভুলত্রুটি উপেক্ষা করার মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলি আমাদের সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।’ গণমাধ্যমে এসব গুণের চিত্র তুলে ধরা হলে মানুষ কেন সেগুলোকে অবাস্তব বলে মনে করে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
নারীরা কল্পনায় একজন স্বামীকে যেভাবে দেখতে চান, পর্দার আবু বকরকে অনেকের কাছে তেমন মনে হয়েছে। আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করা এই নায়কের প্রকৃত নাম শেহেরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকী।
সরোস ইব্রাহীম নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘দার-ই-নিজাত-এ আবু বকর এমন একজন স্বামী, যাকে বাস্তব জীবনেও আমাদের অনেকেই পেতে চাই: যিনি স্ত্রীর প্রতি ধৈর্যশীল, শ্রদ্ধাশীল ও কোমল আচরণ করেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করলেই কি একজন পুরুষ আদর্শ স্বামী হয়ে ওঠেন?’
যদিও আবু বকরকে অবিশ্বাস্য রকমের ভালো মানুষ বলে মন্তব্য করা সমালোচকদের জবাব দিয়েছিলেন অভিনেত্রী নাদিয়া আফগান। তিনি বলেছিলেন, তার নিজের স্বামীর মধ্যেও আবু বকরের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই আবু বকরের আচরণ তার কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
এ দিকে এ আলোচনাও অনেকে তুলছেন, নাটকের ‘আদর্শ স্বামী আবু বকর’ বাস্তব জীবনে স্বামী হিসেবে আসলে কেমন?
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনসহ বিভিন্ন মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করা শেহেরিয়ারের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য। তার জীবনে রয়েছে বাগদান হওয়ার পরও বিয়ে না হয়ে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনাও।
শেহরিয়ার ২০১৯ সালে চিকিৎসক হালা সোমরুর সঙ্গে বাগদান করেছিলেন। পরে সেই বাগদান ভেঙে যায়। সে সময় দ্য কারেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি মাকে বলেছিলেন, এবার কাকে বিয়ে করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে চান। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে করেন অভিনেত্রী মাহিন সিদ্দিকীকে (বর্তমান স্ত্রী)।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দ্য ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারনেটে টিভি নাটকের সবচেয়ে পছন্দের ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’ বা আদর্শ পুরুষ হিসেবে পরিচিত দার-এ-নিজাত নাটকের আবু বকর আসলে ততটা আদর্শ নন। অন্তত নাটকটিতে আবু বকরের চরিত্রে অভিনয় করা শেহরিয়ার মুনাওয়ারের মতে, বিষয়টি এমনই।
বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে হারুন রশিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মুনাওয়ার বলেন, তার চরিত্রের বেশ কিছু বড় দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, তিনি অন্যদের খুশি করতে সব সময় চেষ্টা করেন।
নিজের চরিত্রের এই দুর্বলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুনাওয়ার বলেন, তিনিও নিজে অন্যদের খুশি করতে চান এবং অন্যদের ‘না’ বলতে তার বেশ কষ্ট হয়। তিনি আরও বলেন, আবু বকরের মধ্যে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ বা অন্যদের উদ্ধার করার প্রবণতা রয়েছে। এর কারণ, ‘তার মা তাকে এমনভাবে বড় করেছেন, যাতে সব সময় তার মধ্যে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছেন যে এটাই সঠিক কাজ।’
মুনাওয়ার রশিদকে বলেন, ‘একবার কল্পনা করুন, এই মানুষটি কতটা মানসিক চাপের মধ্যে জীবন কাটায়।’
সাক্ষাৎকারে অভিনেতা আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য জানান। তার চরিত্র আবু বকর জারিয়াবের প্রতি যতটা আগ্রহ প্রকাশ করে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক আগে থেকেই সে জারিয়াবের প্রেমে পড়েছিল—অন্তত চরিত্রটি এভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন মুনাওয়ার।
বিস্মিত সঞ্চালককে মুনাওয়ার জানান, নাটকের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র জারিয়াবের প্রতি আবু বকরের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। মায়ের সঙ্গে জারিয়াবের বাড়িতে যাতায়াতের সময়ই সে সম্ভবত ‘এদিক-সেদিক থেকে কয়েকবার চোরাচোখে তাকিয়েছিল।’
অভিনেতা বলেন, জারিয়াব ও আবু বকরের ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কারণে সে এক দ্বিধায় পড়ে যায়। একদিকে তার মন যা চায়, অন্যদিকে তার বিবেক জানে, সেটি বিপজ্জনক।
মুনাওয়ার আরও বলেন, আবু বকরের প্রেমে পড়ার বিষয়টি দর্শকদের বোঝানোর জন্য তিনি নাটকের বিভিন্ন জায়গায় ইঙ্গিত রেখেছিলেন।
তিনি বলেন, প্রথমবার যখন তারা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে যায়, তখন আবু বকর তাকে বলে, তুমি পাস্তা পছন্দ করো, তাই না? জারিয়াব জিজ্ঞেস করে, তুমি কীভাবে জানো? সে বলে, ‘কিশওয়ার খালা একবার বলেছিলেন।’ এই মেয়েটিকে পছন্দ না করলে আমি কেন কথাটা মনে রাখব? আমি তো পুরো নাটকেই এমন ইঙ্গিত ছড়িয়ে দিয়েছি।