জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান বেহাল দশা বা খেলাপি ঋণের প্রকোপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সামগ্রিক রোগ বা সিস্টেমের একেকটি ‘উপসর্গ’ মাত্র। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও একই সঙ্গে সর্বগ্রাসী সংকটে আক্রান্ত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র এবং রাজনীতি আজ গুটিকয়েক প্রভাবশালী ধনী বা ‘অলিগার্কদের’ স্বার্থে ব্যবহূত হচ্ছে, যা এই সংকটের মূল শেকড়।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল সুশাসনের বুলি আওড়ে কোনো সুফল মিলবে না। শুরুর দিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি বা সংকটের সমস্যাটিকে ‘গ্রাহক চেনাসংক্রান্ত’বা ‘কেওয়াইসি’ সমস্যা মনে হলেও পরবর্তী সময় এটি ব্যাংকার, অসত্ ব্যবসায়ী এবং খারাপ রাজনীতিবিদদের এক বিপজ্জনক ‘অশুভ জোট’ বা ‘নেক্সাস’এ পরিণত হয়েছে। এই সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করলে অর্থনীতি কেবল লাইনচ্যুতই হবে না, বরং নদীতে গিয়ে পড়বে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন মন্তব্য করে ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বর্তমান বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা দখলকারী শাসকরা এ রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা না করে এটিকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সাম্রাজ্য বানিয়ে ফেলেছে, যেখান থেকে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা ও অনুগ্রহ বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত এই শোষণমূলক রাষ্ট্রের প্রকৃতি পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তর করা না যাবে, ততদিন কোনো খাতেরই স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ দেশে বারবার গণঅভ্যুত্থান ঘটলেও এবং মানুষ বারবার রক্ত ঝরালেও কোনো অর্থপূর্ণ সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আসেনি, ফলে জনগণের মধ্যে হতাশা ও অধৈর্যের পুঞ্জীভূত রূপ দেখা যাচ্ছে। কেবল অভ্যুত্থানই কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সঠিক আদর্শিক কাঠামো, জাতীয় পুনর্জাগরণের স্পষ্ট কর্মসূচি এবং নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বের মাধ্যমেই কেবল ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
দেশের বর্তমান সংকটের খুব সহসা সমাধান নেই বলেও মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, দেশ এক বিশাল সমস্যায় নিমজ্জিত যা কাটিয়ে উঠতে সময় ও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। রাতারাতি কোনো জাদুকরী সমাধান বা অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। কারণ অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক সংশোধন এবং ব্যাংকার-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীর অনৈতিক চক্রের অবসান ঘটানো জরুরি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ইচ্ছাকৃত অনিয়ম এবং দুর্নীতি দূর করতে সামাজিকভাবে দুষ্কৃতকারীদের প্রতি ঘৃণা ও অনাস্থা প্রদর্শনের মাধ্যমেই কেবল সমাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-ই-খোদা। ‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যা : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় সমাধান’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাংক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এলেও খেলাপি ঋণ, সুশাসনের অভাব, মূলধন ঘাটতি, তারল্যসংকট, অর্থ পাচার এবং ব্যাংকারদের নিম্ন উত্পাদনশীলতার মতো চ্যালেঞ্জের কারণে ব্যাংক খাতের সম্ভাবনা পুরোটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাব, নমনীয় নীতিমালা, বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এ অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণকে আরো উসকে দিয়েছে।
পারিবারিক পরিচালকদের আধিপত্য ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের দক্ষতার অভাব ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করেন বরকত-ই-খোদা। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে মাত্র ১০টির মতো ব্যাংক ভালো পারফর্ম করছে, অন্যদিকে বাকি ব্যাংকগুলোয় চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক খাতের এ পরিস্থিতি উত্তরণে বেশকিছু কাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে কৌশলগত কাঠামোর অধীনে আর্থিক খাতের বড় পুনর্গঠন চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ব্যাংকের জট কমানো দরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সুপরিচালনযোগ্য ব্যবস্থায় নামিয়ে আনা দরকার।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।