চট্টগ্রামে বোর্ডে ফল তৈরিতে জালিয়াতি

খাতায় প্রাপ্ত নম্বর শূন্য পেয়েও চূড়ান্ত ফলাফলে ৪৫, চারজনের বিরুদ্ধে মামলা

এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্রে শূন্য পেলেও প্রকাশিত ফলাফলে নম্বর এসেছে ৪৫। এমনকি কয়েকটি বিষয়ে উত্তরপত্রের প্রকৃত নম্বরের চেয়ে অনেক বেশি নম্বর দেখিয়ে ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। খাতা পুনঃনিরীক্ষণের সময় এ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পর এক শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তিন কর্মচারীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলাটি করেন শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন।

মামলার আসামিরা হলেন শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভন এবং শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারী ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, রাশেদুল ইসলাম ও নূর হোসেন রায়হান।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শোভন এসএসসি পরীক্ষায় ১০ বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও প্রকাশিত ফলাফলে নম্বর পরিবর্তন করে তাকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারীকে দায়ী করা হয়েছে।

পাঁচলাইশ থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, শিক্ষা বোর্ডের তিন কর্মচারীসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমরা মামলাটি তদন্ত করছি।

বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, হাসিবুল আলী শোভন এ বছর আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। 

মামলার বাদি ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ওই শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের সময় খাতার নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের নম্বরের মিল না থাকায় পরীক্ষক বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডকে অবহিত করেন। এরপর আমরা বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে ওই শিক্ষার্থীর আরও কয়েকটি বিষয়ে একই ধরনের ঘটনা দেখতে পেয়েছি।

তিনি বলেন, এ প্রেক্ষিতে পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী কলেজ ভর্তির আগেই তার ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মামলা করার জন্য আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ থানায় মামলা করা হয়।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করে ওই শিক্ষার্থী। পুনর্নিরীক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের উত্তরপত্রের নম্বরের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেল থেকে পাওয়া প্রিন্ট আউটের নম্বরের ব্যাপক পার্থক্য দেখতে পান। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান। পরে বোর্ডের প্রোগ্রামার যাচাই করে নম্বরের গরমিলের সত্যতা পান।

এ ঘটনায় বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দুজন আইসিটি বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহযোগিতায় মূল উত্তরপত্র, পরীক্ষকদের পাঠানো ম্যানুয়াল নম্বর ফর্দ, প্রকাশিত ফলাফল, এমসিকিউ ওএমআর এবং কম্পিউটার সেলের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে। গত ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তে শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বর বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলার প্রথম পত্রে ২৩ নম্বরকে ৩৩, দ্বিতীয় পত্রে ২৪ নম্বরকে ৬২, ইংরেজির প্রথম পত্রে ৩৩ নম্বরকে ৮৩ এবং দ্বিতীয় পত্রে ২০ নম্বরকে ৮২ করা হয়। গণিতে ৯ নম্বর বাড়িয়ে ৬৬, ইসলাম শিক্ষায় ৭ থেকে ৬৪, উচ্চতর গণিতে শূন্য থেকে ৪৬, পদার্থবিজ্ঞানে শূন্য থেকে ৪৫, রসায়নে ১ থেকে ৪৬, জীববিজ্ঞানে ১ থেকে ৪৬ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৪ থেকে ৬৫ নম্বর করা হয়।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পুনর্নিরীক্ষণের সময় ৩৪টি খাতার নম্বরপত্র বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সে সময় পুনর্নিরীক্ষণের ফল জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বোর্ডও তদন্ত কমিটি করেছিল তবে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এরআগে ২০২৩ সালে একইভাবে ছেলের পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে।

২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নগরীর একটি বেসরকারি কলেজ থেকে অংশ নেন নারায়ণ চন্দ্রের ছেলে নক্ষত্র দেব নাথ। পরে তার ছেলের জিপিএ-৫ প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন শিক্ষক। এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়।

কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে নক্ষত্র দেবের ফলাফল বাতিল করা হয়। সে সময় তদন্ত কমিটি নারায়ণের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার পরামর্শ দিয়েছিল। এর ভিত্তিতে মামলার পর অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথকে গ্রেপ্তার করা হয়।