পার্বত্য অঞ্চলে মূল সমস্যা এলাকার আধিপত্য ও চাঁদাবাজি। দুইটি সংগঠনের মধ্যে চাঁদাবাজি ও এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, গুম, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি ও শস্যের খেত পুড়িয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনের অপরাধ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে পার্বত্য তিন জেলায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে। কিন্তু জেএসএস (মূল শন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (মূল প্রসিত) দুই সংগঠনের চাঁদাবাজি ও এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়শই হত্যা, অপহরণ, খুন ও দখল এবং পালটা দখলের অভিযোগ রয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ২১৭ জন এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১০৮ জন সদস্যের প্রাণহানি হয়েছে। আনসার ও পুলিশ সদস্যরাও নিহত হয়েছেন। বর্তমানে পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ি বাঙালি বসবাস প্রায় সমান। জানা গেছে, তারা একে অপরকে সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের বক্তব্য, পাহাড়ি-বাঙালিদের কোনো সমস্যা নেই। মূলত জেএসএস (মূল) ও ইউপিডিএফ (মূল) এই দুইটি সংগঠন চাঁদাবাজি, আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ, গুম, খুন, অপহরণসহ অপরাধ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্গম এলাকায় চিকিত্সাব্যবস্থা, বিদ্যুত্ এমনকি খাবার পানির সুব্যবস্থা ছিল না। এই তিনটি পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সব ব্যবস্থা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে করা হয়েছে। নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্প করে ফ্রি চিকিত্সাসেবা দিয়ে আসছে। পাশাপাশি বিজিবিও এসব সেবা দিয়ে আসছে। দুর্গম এলাকাবাসীর কাছে জেএসএস (মূল) ও ইউপিডিএফ (মূল) এক আতঙ্কের নাম। বর্তমানে পাহাড়ে দুর্গম এলাকা শুরু করে সর্বত্রই উন্নয়ন হয়েছে। শান্তি চুক্তির পর পাহাড়িদের সন্তান কোটা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন স্তরে চাকরি পাচ্ছে। বর্তমানে পাহাড়িদের অনেক সন্তানও কর্মরত রয়েছে। ১৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে তিন পার্বত্য জেলায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঐ দুইটি গ্রুপ তিনটি পার্বত্য জেলায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করার কারণে সকল উন্নয়নমূলক কাজ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
জানা গেছে, সাজেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জেএসএস (মূল সন্তু লারমা) নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। প্রতিটি পর্যটন স্পট, দোকান, কটেজ হোটেল, মোটেল, দোকানপাট থেকে চাঁদাবাজি করে আসছিল। ইউপিএফ (মূল প্রসিত) বর্তমানে সাজেক দখল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পাহাড়ি বাঙালিদের অভিযোগ, হাট-বাজার, দোকানপাট ছাড়াও একটি কাঠাল, কলারছড়া কিংবা মোরগও বাজারে বিক্রি করতে গেলে ঐ দুই গ্রুপকে চাঁদা দিতে হয়। নির্মাণকাজ থেকে শুরু ছোট-বড় কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা না দিয়ে জীবন রক্ষা করতে পারবে না বলে তাদের অভিযোগ।
জানা গেছে, পার্বত্য তিনটি জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভূমির একক আধিপত্য হেডম্যানদের হাতে। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী শন্তু লারমার নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক সদস্য আত্মসমর্পণ করলেও সিংহভাগ আত্মসমর্পণ করেনি। সব ধরনের অস্ত্র পুরোপুরি জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা ভাঙাচোরা অস্ত্র জমা দেয় বলে জানা গেছে। তারা চাঁদা আদায়, আধিপত্য বিস্তার, দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়। তাদের দাবি, সাজেকের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে এসব অস্ত্রই ব্যবহূত হচ্ছে।
জানা গেছে, শান্তি চুক্তির বিরুদ্ধে যে কথা বলবে তাকে হেডম্যান পদ দেওয়া হয়। কয়েকটি গ্রাম কিংবা মৌজা জুড়ে হেডম্যানদের প্রভাব। তারা এলাকাটি ‘রাজতন্ত্রে’র মতো শাসন করেন। একজন হেডম্যান মারা গেলে তার বংশধররাই নেতৃত্বে আসেন। জমি বিক্রি করতে গেলে ক্রেতা-বিক্রেতা হেডম্যানের কাছ থেকে সনদ নিতে বাধ্য। হেডম্যানরা যা লিখে দেন জেলা প্রশাসক বা সার্কেল প্রধান তাই বাস্তবায়ন করেন।
ভূমি নিয়ে পাহাড়ি বাঙালিদের মধ্যে বিরোধ চরমে। তবে চাকমা সম্প্রদায়ের এই সুযোগ বেশি ভোগ করে থাকেন। অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে পাহাড়ি বাঙালিরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ি বাঙালিরা কাগজ যার জমি তার—এই নীতি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনটি পার্বত্য জেলায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, মুরং, তঞ্চঙ্গ্য, খুমী, লুসাই, খয়াং, উষাই, পাংখু, চাক এবং বাঙালিদের বসবাস। তাদের একটাই দাবি, ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতার নিরসন এবং শান্তি ও সম্প্রীতির সহাবস্থানের নিশ্চয়তা।