২১ মাসে আহত ১০৪৩

পুলিশের ওপর বারবার হামলা

মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। মাদকবিরোধী অভিযান থেকে শুরু করে আসামি গ্রেফতার অথবা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। কোথাও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে, কোথাও পিটিয়ে আহত করা হচ্ছে তাদের।

অপরদিকে, বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মাদক সংশ্লিষ্টতা ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পুলিশের ভাবমূর্তি ও জনআস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গত ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে ডাকাতি করতে গিয়ে এক পুলিশ সদস্য আটক হয়েছে। বান্দরবানে চোরাই মোটরসাইকেলসহ দুই পুলিশ সদস্য আটক হয়েছেন। সব মিলিয়ে হামলা, মামলা ও আস্থার সংকটে চাপে রয়েছে পুলিশ বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধসংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে হামলায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৬০১ জন এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৪৪২ জন আহত হন। অর্থাৎ, চলতি বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৯ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। তবে আহতদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া সদস্যের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের অনুসন্ধানে মাদকবিরোধী অভিযানকে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া আসামি ধরতে গিয়ে, মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়ও হামলার শিকার হচ্ছেন তারা।

সাম্প্রতিক হামলায় উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৯ পুলিশ সদস্য আহত হন। এর মধ্যে দুজনকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগের দিন গাজীপুরের জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। মাদকসহ আটক দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিতে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
গত ৭ অক্টোবর খুলনায় দায়িত্ব শেষে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম। তার দুই হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধী নিয়েছেন। গত ১৬ অক্টোবর তাকে দেখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।

আইজিপি বলেন, হামলাকারীদের গ্রেফতার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চলছে। পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সদস্য এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর রায়েরবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী ও ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানেও আসামি গ্রেফতার এবং অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বাহিনীর ভেতরেও শৃঙ্খলার প্রশ্ন
পুলিশের ওপর হামলার পাশাপাশি বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক সংশ্লিষ্টতা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে অর্ধশতাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছেন। মাদকাসক্তি পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়ার পর ১৬৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বাহিনীকে আরো কার্যকর, গতিশীল ও জনবান্ধব করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেঞ্জ, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।